সৈকত, ক্যাসিনো কিংবা রাতের জীবনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত গোয়া। তবে এই উপকূলীয় রাজ্যের আরেকটি পরিচয় রয়েছে, যা অনেক পর্যটকের চোখ এড়িয়ে যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পর্তুগিজ শাসনের উত্তরাধিকার আজও গোয়ার স্থাপত্য, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, নাম-পরিচয় এবং ফুটবলপ্রেমে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ভারতীয় মানচিত্রের অংশ হয়েও গোয়া যেন বহন করে চলেছে ইউরোপীয় এক অতীতের স্মৃতি।
২৮ মে গভীর রাতে মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম এলাকা প্রায় জনশূন্য। স্টেডিয়ামের আলো নিভে গেছে অনেক আগেই। হোটেলে ফেরার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল দুই স্থানীয় বাসিন্দার কাছে। তাঁদের একজন, ফেরলে মার্টিন রাজ, বিনা দ্বিধায় নিজের মোটরসাইকেলে তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
পথ চলতে চলতে আলাপচারিতায় উঠে আসে গোয়ার সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নানা দিক। খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ছোট ব্যবসায়ী রাজ শুধু হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাবই দেননি, বরং নিজের বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানেই শুরু হয় গোয়ার ভিন্ন এক পরিচয় আবিষ্কারের গল্প।
গোয়া ১৫১০ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার শতাব্দী পর্তুগিজ শাসনের অধীনে ছিল। দীর্ঘ এই সময়ের প্রভাব আজও স্পষ্ট। ডিসুজা, ফার্নান্দেজ, রদ্রিগেজ কিংবা পেরেইরার মতো পদবি, ইউরোপীয় ধাঁচের বাড়িঘর, পুরোনো গির্জা এবং স্থানীয় জীবনযাপনে সেই ইতিহাসের ছাপ রয়ে গেছে।
আলাপের এক পর্যায়ে রাজ জানান, তিনি গোয়ায় বসবাস করলেও তাঁর পাসপোর্ট পর্তুগালের। এমন আরও অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের পারিবারিক সূত্রে পর্তুগিজ নাগরিকত্ব রয়েছে। তাঁর কথায়, গোয়ার অনেক পরিবার আজও পর্তুগালের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও আবেগগত সম্পর্ক অনুভব করে।
ইতিহাসের জীবন্ত জাদুঘর ওল্ড গোয়া
গোয়ার ঐতিহাসিক কেন্দ্র ওল্ড গোয়া বা ভেলহা গোয়া যেন পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের এক উন্মুক্ত জাদুঘর। এখানে অবস্থিত বিখ্যাত বাসিলিকা অব বম জেসুস, যার নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৫৯৪ সালে এবং শেষ হয় ১৬০৫ সালে।
রেনেসাঁ ও বারোক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই গির্জাটি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খ্রিষ্টীয় ঐতিহাসিক নিদর্শন। এখানেই সংরক্ষিত রয়েছে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের মরদেহ। প্রতি ১০ বছর পর বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে তা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
১৯৮৬ সালে ইউনেসকো ওল্ড গোয়ার ঐতিহাসিক গির্জা ও মঠসমূহকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। ফলে এটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
পাশেই রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম গির্জাগুলোর একটি সে ক্যাথেড্রাল। এর বিখ্যাত ‘গোল্ডেন বেল’ দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। অন্যদিকে চার্চ অব সেন্ট কাজেতান নির্মিত হয়েছে রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার স্থাপত্য অনুসরণ করে।
রোনালদোকে ঘিরে ফুটবল আবেগ
গোয়ার পরিচয়ের সঙ্গে ফুটবল যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় রাজ্যের বহু বাড়িতে দেখা যায় পর্তুগালের পতাকা। ফুটবল তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখানে শুধু একজন খেলোয়াড় নন, অনেকের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার প্রতীক।
গোয়ার অন্যতম প্রাচীন ক্লাব ভাস্কো স্পোর্টসের ফুটবল সম্পাদক মারিও ডি সুজার মতে, বিশ্বকাপের সময় অধিকাংশ গোয়ান সমর্থন করেন পর্তুগালকে। রোনালদোর জনপ্রিয়তা এখানে অন্য মাত্রার।
স্থানীয় তরুণ ফুটবলপ্রেমী অ্যালেন ফার্নান্দেজ মনে করেন, কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার কারণে রোনালদো তাঁদের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য। একই অনুভূতি ব্যক্ত করেন মারিয়া ফার্নান্দেজও। তাঁর ভাষায়, ছোটবেলা থেকেই তাঁরা পর্তুগাল ও রোনালদোকে দেখে বড় হয়েছেন।
তবে শুধু রোনালদো নন, লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং নেইমারেরও অসংখ্য ভক্ত রয়েছে গোয়ায়।
রঙিন গলি আর ইউরোপীয় আবহ
পানাজির ঐতিহাসিক ফন্টেনহাস এলাকায় হাঁটলে অনেকেরই মনে হতে পারে, তাঁরা যেন ইউরোপের কোনো ছোট শহরে এসে পৌঁছেছেন।
লাল, হলুদ ও নীল রঙের পুরোনো পর্তুগিজ বাড়ি, নকশা করা কাঠের বারান্দা, টাইলসের নামফলক এবং ছোট ছোট গির্জা মিলিয়ে এলাকা জুড়ে এক ভিন্ন আবহ তৈরি হয়েছে। এখানকার রেস্তোরাঁগুলোতে পর্যটকেরা ভিন্ডালু এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বেবিঙ্কার স্বাদ নিতে ভোলেন না।
নাগরিকত্বের জটিল বাস্তবতা
স্থানীয় সাংবাদিক রাহুল চান্দাওয়ারকর জানান, ১৯ ডিসেম্বর ১৯৬১ সালের আগে গোয়ায় জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের বংশধরেরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে পর্তুগিজ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন।
উন্নত জীবনযাত্রা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে সহজ যাতায়াত এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে অনেকেই এই পথ বেছে নিয়েছেন।
তবে পর্তুগিজ নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। এর পরিবর্তে তাঁরা ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া বা ওসিআই কার্ড পান। এর মাধ্যমে ভারতে বসবাস ও সম্পত্তি কেনার সুযোগ থাকলেও ভোটাধিকার পাওয়া যায় না।
বদলে যাচ্ছে জনসংখ্যা ও ভাষার চিত্র
সময়ের সঙ্গে গোয়ার সামাজিক ও জনসংখ্যাগত চিত্রেও পরিবর্তন এসেছে।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে গোয়ার জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশ ছিল খ্রিষ্টান, ৫০ শতাংশ হিন্দু এবং ৫ শতাংশ মুসলিম। বর্তমানে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। খ্রিষ্টান জনসংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২৬ শতাংশে এবং মুসলিম জনসংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ।
অনেক খ্রিষ্টান পরিবার পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভাষার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। কঙ্কনির পাশাপাশি বর্তমানে ইংরেজি ও হিন্দির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ফুটবলের রাজধানী থেকে পরিবর্তনের পথে
ভারতে ফুটবলের প্রাচীন কেন্দ্রগুলোর অন্যতম গোয়া। দীর্ঘ পর্তুগিজ শাসনের সময়ই এখানে ফুটবলের বীজ রোপিত হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের মতে, আগের মতো উন্মাদনা এখন আর নেই।
রাহুল চান্দাওয়ারকরের মতে, গোয়ায় ফুটবল এখনো জনপ্রিয় হলেও বাংলা, কেরল কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি রাজ্যের মতো ধারাবাহিক ফুটবল সংস্কৃতি ধরে রাখা যায়নি। বর্তমানে ভারতের অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার উঠে আসছেন মণিপুর, মেঘালয়সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে।
তিনি আরও বলেন, এফসি গোয়ার ম্যাচে হাজারো দর্শক মাঠে এলেও ভারতের নারী জাতীয় ফুটবল দলের ম্যাচে গ্যালারি প্রায় ফাঁকাই থাকে। এটি দেশের ফুটবল সংস্কৃতির বৈষম্যমূলক বাস্তবতাও তুলে ধরে।
ইতিহাস, পরিচয় ও আবেগের মিলনস্থল
গোয়ার গল্প শুধু সমুদ্রসৈকত, পর্যটন কিংবা বিনোদনের নয়। এটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, নাগরিকত্বের জটিলতা এবং ফুটবলকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক অনন্য পরিচয়ের গল্প।
ভারতের অংশ হয়েও গোয়া আজও বহন করে চলেছে পর্তুগালের স্মৃতি। আর সেই কারণেই অনেকের কাছে গোয়া যেন ভারতের বুকে এক টুকরো পর্তুগাল।