বিশ্বজুড়ে পর্যটন খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেও চরম আবহাওয়া, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং পর্যটকদের পরিবর্তিত আচরণ ভবিষ্যতের ভ্রমণকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পর্যটন গন্তব্যগুলোকে আরও প্রস্তুত ও অভিযোজনক্ষম হতে হবে।
২০২৫ সালে পর্যটকের সংখ্যা রেকর্ড
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সদস্য দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৮৪ কোটি ৭০ লাখে পৌঁছেছে। এটি এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
তবে সব দেশে একই চিত্র দেখা যায়নি। ওইসিডির প্রকাশিত ‘ট্যুরিজম ট্রেন্ডস অ্যান্ড পলিসিস ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সদস্য দেশগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ২০২৫ সালের তুলনায় আরও ভালো পর্যটন ফল আশা করছে। অনেক দেশ রেকর্ডও গড়তে পারে।
২০২৫ সালে চারটি দেশে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা দুই অঙ্কে বেড়েছে। এর মধ্যে ফিনল্যান্ডে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ, জাপানে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নরওয়েতে বেড়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
এর আগে ২০২৪ সালেও জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় পর্যটন খাতে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার হয়েছিল। উন্নত বিমান যোগাযোগ এবং জাপানি ইয়েনের দুর্বল মূল্য এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে কয়েকটি দেশে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা কমেছে এবং এখনো কোভিড মহামারীর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
এই তালিকায় থাকা দেশগুলোরমধ্যে কানাডায় ০ দশমিক ৬ শতাংশ, জার্মানিতে ০ দশমিক ৮ শতাংশ, আয়ারল্যান্ডে ২ দশমিক ৮ শতাংশ ও যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে
সাড়ে ৫ শতাংশ।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ইসরায়েলের পর্যটন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটিতে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা এখনো করোনা-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০.৮ শতাংশ কম।
সংঘাত বদলে দিচ্ছে ভ্রমণের ধরন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ প্রবাহে প্রভাব ফেলেছে এবং ভ্রমণের খরচও বাড়িয়েছে। ফলে পর্যটকদের আস্থা কমছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিমান যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল গন্তব্যগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। স্বল্পমেয়াদে এই পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনাও কম।
ওইসিডির মহাসচিব ম্যাথিয়াস করমান বলেন, করোনা মহামারি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশগুলোকে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটক ব্যবস্থাপনাও এমনভাবে করতে হবে, যেন পর্যটন খাত দীর্ঘমেয়াদে সবার জন্য সুফল বয়ে আনে।
প্রতিবেদন বলছে, নিরাপত্তা, ভ্রমণ ব্যয় এবং বুকিং বাতিল হওয়ার আশঙ্কার কারণে অনেক পর্যটক এখন পরিচিত ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন। তারা কম দিনের ভ্রমণ এবং কম খরচের বিকল্পকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
এ কারণে বিমান সংস্থা, ট্যুর অপারেটর এবং পর্যটনসেবাদাতাদেরও ২০২৭ ও পরবর্তী সময়ের পরিকল্পনায় নতুন ভ্রমণ প্রবণতা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।
চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি
তাপপ্রবাহ, দাবানল, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন চরম আবহাওয়া এখন ভ্রমণ গন্তব্য নির্বাচন এবং ভ্রমণের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যটন পরিকল্পনার মধ্যেই ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ পর্যটকদের জন্য বহুভাষিক জরুরি সতর্কতা অ্যাপ চালু করেছে।
প্রতিবেদনটি আরও বলছে, চরম আবহাওয়া মোকাবিলায় টেকসই পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দায়িত্বশীল পর্যটনে ঝুঁকছে বিশ্ব
প্রতিবেদনটি বলছে, শুধু পর্যটক বাড়ালেই হবে না; পর্যটনের সুফল স্থানীয় জনগণের কাছেও পৌঁছাতে হবে।
এ জন্য পর্যটকদের চাপ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া, যৌথ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে আরও বেশি গন্তব্য স্থানীয় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ স্বীকৃতি কর্মসূচি, কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন এবং বড় আন্তর্জাতিক চেইনের বাইরে স্থানীয় ব্যবসায় পর্যটকদের ব্যয় উৎসাহিত করতে পারে।
এ ছাড়া অনেক দেশ পর্যটন কর, নির্দিষ্ট সংখ্যক দর্শনার্থীর সীমা, নির্ধারিত সময়ভিত্তিক প্রবেশব্যবস্থা এবং জনপ্রিয় শহরের পরিবর্তে কম পরিচিত দ্বিতীয় সারির শহর বা অফ-সিজনে ভ্রমণকে উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপও নিতে পারে।