বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও প্রত্যাশিত জলরাশি না থাকায় কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওড়ে এবার দেখা দিয়েছে পর্যটকের ভাটা। প্রতিবছর এ সময় যেখানে হাজারো ভ্রমণপিপাসুর পদচারণায় মুখর থাকে হাওড়, সেখানে এখন বিরাজ করছে অনেকটাই নির্জন পরিবেশ। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া, আগাম পানি নেমে যাওয়া, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগের কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এর প্রভাব পড়েছে হাওড়কেন্দ্রিক পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় বর্ষাকালীন পর্যটন গন্তব্য নিকলী হাওড়। বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌভ্রমণ, অলওয়েদার সড়ক এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখানে ভিড় করেন। ২০২০ সালে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক চালু হওয়ার পর এ অঞ্চলে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর সঙ্গে গড়ে ওঠে নৌকা, স্পিডবোট, হোটেল, রেস্তোরাঁ, কফি শপ, গাইডিং ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে ঘিরে একটি বড় স্থানীয় অর্থনীতি।

কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই চিত্র বদলে গেছে। হাওড়ে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেক এলাকায় নৌকা চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। ফলে ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা থাকলেও যাত্রী মিলছে না। হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, কফি শপ ও অন্যান্য ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও বিক্রি কমে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১০ হাজার নৌকার মাঝিসহ হাজারো মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটক কমে যাওয়ায় তাদের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মাঝিদের অভিযোগ, প্রতিদিন একাধিক নৌভ্রমণের সুযোগ থাকলেও এখন অনেক সময় একটি ট্রিপও পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীর বেতন ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।

পর্যটকদের একটি অংশের মতে, নিকলী হাওড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখনও আকর্ষণীয়। তবে পানি কম থাকায় প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি নৌকায় পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, উদ্ধার সরঞ্জাম, সাইনবোর্ড, পরিচ্ছন্নতা এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হলে পর্যটকদের আস্থা আরও বাড়বে।

স্থানীয়দের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আগাম পানি নেমে যাওয়ার কারণে হাওড়ের স্বাভাবিক রূপ বদলে যাচ্ছে। এর ফলে শুধু পর্যটন নয়, হাওড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ সংরক্ষণ পরিকল্পনার পাশাপাশি পর্যটন ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ নদীপথে টহল, নৌ পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশকে সম্পৃক্তকরণ, স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক নজরদারি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের তথ্য ও সহায়তার জন্য একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহীদউল্লাহ বলেন, হাওড়ে পর্যাপ্ত পানি এলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে নৌযানের ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে পর্যটন এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সেবার মান উন্নয়নে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে।