আর্জেন্টিনার উত্তরাঞ্চলের জুজুই প্রদেশে ১০ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক করিডর কেব্রাদা দে হুমাউয়াকা এখন নতুন পরিচয়ে বিশ্ব পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। ইউনেসকো স্বীকৃত এই উপত্যকায় চালু হয়েছে লাতিন আমেরিকার প্রথম সৌরচালিত ট্রেন, যা পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের পাশাপাশি স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আর্জেন্টিনার ভলকান গ্রাম থেকে শুরু হওয়া ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে ২০২৪ সালের জুনে চালু হয় কেব্রাদা সোলার ট্রেন। কাচঘেরা দুই বগির আধুনিক এই ট্রেনটি সম্পূর্ণ শূন্য-নির্গমন প্রযুক্তিতে পরিচালিত হয় এবং ঘণ্টায় প্রায় ৩৩ কিলোমিটার গতিতে পাহাড়ি উপত্যকা অতিক্রম করে।
যে উপত্যকার মধ্য দিয়ে ট্রেনটি চলাচল করে, সেটি ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। কেব্রাদা দে হুমাউয়াকা হাজার হাজার বছর ধরে আন্দিজ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি ইনকা সড়ক নেটওয়ার্ক কাপাক নিয়ান-এরও অংশ। খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০০ অব্দ থেকে শিকারি সম্প্রদায়, পরে ইনকা সাম্রাজ্যের বার্তাবাহক এবং স্প্যানিশ উপনিবেশিক যুগের মানুষের যাতায়াতের সাক্ষী এই পথ।
ট্রেনটির প্রথম স্টপেজ তুম্বায়া। এখানে ঐতিহ্যবাহী কাদামাটির ঘর ও প্রাচীন চার্চ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সেখান থেকে পুরমাকারা গ্রামে পৌঁছে দেখা যায় বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক বিস্ময় সেরো দে লোস সিয়েতে কোলোরেস বা সাত রঙের পাহাড়। স্থানীয় বাজারে লামার উলের পোশাক, হস্তশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী পাওয়া যায়।
পাহাড়ি পথে ভ্রমণের সময় চোখে পড়ে আপাচেতাস নামে পরিচিত পাথরের স্তূপ। স্থানীয় আদিবাসীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, নিরাপদ যাত্রার প্রার্থনায় এখানে পাচামামা বা মাদার আর্থের উদ্দেশ্যে কোকা পাতা ও অন্যান্য প্রতীকী উপহার উৎসর্গ করা হয়।
পরবর্তী স্টপেজ হর্নিওসে রয়েছে ১৭৭২ সালে নির্মিত একটি পোস্টাল জাদুঘর, যা একসময় বুয়েনস এইরেস ও বলিভিয়ার মধ্যকার বণিকদের বিশ্রামকেন্দ্র ছিল। এরপর মাইমারা এলাকায় দেখা যায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো কৃষি টেরাস। এখানকার বাজারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আলু, কালো পুদিনা, আন্দিয়ান জাফরান এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার হুমিতা ও তামালেস পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।
এই যাত্রার শেষ গন্তব্য তিলকারা। স্টেশন থেকে অল্প হাঁটার দূরত্বে রয়েছে ওমাগুয়াকা আদিবাসীদের নির্মিত প্রায় ১ হাজার ১০০ বছরের পুরোনো পাথরের দুর্গ পুকারা দে তিলকারা, যা অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেব্রাদা সোলার ট্রেন শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, বরং টেকসই পর্যটনের একটি সফল উদাহরণ। পরিবেশের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি এটি স্থানীয় তরুণদের নিজ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
কেব্রাদা সোলার ট্রেন এক নজরে
- অবস্থান: জুজুই প্রদেশ, আর্জেন্টিনা
- রেলপথের দৈর্ঘ্য: ৪২ কিলোমিটার
- চালু: জুন ২০২৪
- বিশেষত্ব: লাতিন আমেরিকার প্রথম সৌরচালিত ট্রেন
- সর্বোচ্চ গতি: ঘণ্টায় প্রায় ৩৩ কিলোমিটার
- ইউনেসকো স্বীকৃতি: কেব্রাদা দে হুমাউয়াকা বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা