লন্ডন, প্যারিস ও রোম— শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তিনটি শহরেরই আছে নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও জীবনধারা। তবে প্রতিটি রাজধানীর আলাদা বিশেষত্ব রয়েছে। কোথাও বিশ্বখ্যাত জাদুঘর, কোথাও অনন্য রন্ধনশৈলী, আবার কোথাও হাজার বছরের ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
প্রথমবার ইউরোপে শহরভিত্তিক ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন বা পঞ্চমবার, যাতায়াতের সুবিধা, দর্শনীয় স্থান, খাবার এবং ভ্রমণ ব্যয়— সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। চলুন দেখে নেওয়া যাক, ইউরোপের পর্যটনের তিন পরাশক্তি— লন্ডন, প্যারিস ও রোম কোন দিক থেকে কে কতটা এগিয়ে।
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
ইউরোপের সিটি ব্রেক বা স্বল্প সময়ের শহরভিত্তিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে লন্ডন এখনও অন্যতম সেরা গন্তব্য। ইতিহাস, আধুনিকতা, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার অনন্য সমন্বয় এই শহরকে প্রতি বছর কোটি কোটি পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।
বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর দুটি— হিথ্রো ও গ্যাটউইক লন্ডনে অবস্থিত। এছাড়া ইউরোস্টার ট্রেনের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব।
হোটেল খাতেও লন্ডন এগিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ফিটজরোভিয়ায় নিউম্যান হোটেল এবং মেফেয়ারে চ্যান্সারি রোজউড চালু হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালেই খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া লন্ডন-অ্যাডমিরালটি আর্চ, যা বছরের অন্যতম প্রতীক্ষিত বিলাসবহুল হোটেল।
যাতায়াত আরও সহজ করতে টিউব নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, সবুজ উন্মুক্ত স্থান বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনে বিনিয়োগ করছে শহর কর্তৃপক্ষ।
দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ন্যাশনাল গ্যালারি এবং বিখ্যাত ওয়েস্ট অ্যান্ড থিয়েটার জেলা। একই সঙ্গে ক্যামডেন ও শোরডিচের আধুনিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী পাব এবং অসংখ্য মিশেলিন-তারকাপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁ লন্ডনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইট ট্রিপঅ্যাডভাইজরের ২০২৬ সালের ইউরোপের সেরা গন্তব্য তালিকায় লন্ডন শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া রেজোন্যান্স কনসালট্যান্সি প্রকাশিত ইউরোপের সেরা শহরের তালিকাতেও লন্ডন এক নম্বরে।
তবে একটি বড় অসুবিধা হলো, লন্ডন ব্যয়বহুল। ভরা মৌসুমে তিন তারকা হোটেলের গড় ভাড়া পড়ে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ হাজার টাকা। আর মাঝারি মানের রেস্তোরাঁয় দুজনের ‘তিন কোর্সের’ খাবারে চলে যাবে ১৩ হাজার টাকার মতো। স্থানীয় পরিবহনে একমুখী যাত্রায় চলে যাবে প্রায় ৫০০ টাকা।
প্যারিস, ফ্রান্স
বিশ্বের অন্যতম রোমান্টিক শহর হিসেবে পরিচিত প্যারিস এখন নতুন রূপে নিজেকে গড়ে তুলছে।
২০২৪ সালের অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক আয়োজনের পর শহরটি আরও সবুজ, আধুনিক ও সহজে চলাচলযোগ্য হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন সাংস্কৃতিক আকর্ষণ।
বর্তমানে প্যারিসে এক হাজার কিলোমিটারের বেশি সাইকেল লেন রয়েছে, যা শহরটিকে সাইকেলবান্ধব নগরীতে পরিণত করেছে। পাশাপাশি মেট্রো নেটওয়ার্কও আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বিশ্বখ্যাত ল্যুভর জাদুঘর কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় সংস্কার প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেখানে মোনালিসার জন্য থাকবে আলাদা প্রদর্শনী কক্ষ। অন্যদিকে মিউজে দ’অরসে নতুন গ্যালারি চালু করেছে এবং নতুন কার্টিয়ার ফাউন্ডেশন ফর কনটেম্পোরারি আর্ট যুক্ত হয়েছে দর্শনীয় স্থানের তালিকায়।
খাবারের ক্ষেত্রেও প্যারিস ইউরোপের অন্যতম সেরা শহর। এখানে রয়েছে ১২০টিরও বেশি মিশেলিন-তারকাপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁ। বিলাসবহুল হোটেলগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ফোর সিজনস হোটেল জর্জ ফাইভ সম্প্রতি তাদের সব কক্ষ ও স্যুট নতুনভাবে সংস্কার করেছে।
প্যারিসে গেলে অবশ্যই দেখতে হবে আইফেল টাওয়ার, রাতের আলোয় ঝলমলে সেন নদী এবং পুনরায় দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া নোত্র দাম ক্যাথেড্রাল।
ট্রিপঅ্যাডভাইজরের তালিকায় প্যারিস দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। আর ব্যয়ের দিক থেকে এটি লন্ডনের তুলনায় কিছুটা সাশ্রয়ী।
ভরা মৌসুমে তিন তারকা হোটেলে গড় ভাড়া পড়ে ৪০ হাজার টাকার মতো। মাঝারি মানের রেস্তোরাঁয় দুজনের তিন কোর্সের খাবারে যাবে প্রায় ১০ হাজার টাকা। স্থানীয় পরিবহনে একমুখী ভাড়া পড়বে প্রায় ৩৬০ টাকা।
রোম, ইতালি
হাজার বছরের ইতিহাসের শহর রোমে ভ্রমণের জন্য এখন অন্যতম সেরা সময়।
২০২৫ সালের জুবিলি উপলক্ষে শহরের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। লার্গো দি তোরে আর্জেন্তিনা, যেখানে জুলিয়াস সিজার নিহত হয়েছিলেন, এখন উন্মুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক পার্ক। পাশাপাশি শিল্পী কারাভাজ্জিওকে ঘিরে আয়োজন করা হয়েছে একাধিক বিশেষ প্রদর্শনী।
বিলাসবহুল হোটেলের সংখ্যাও বেড়েছে। নতুন যুক্ত হয়েছে পালাজ্জো তালিয়া, বুলগারি রোমা, সিক্স সেন্সেস রোম এবং রোমিও রোমা। অন্যদিকে পুরোনো জনপ্রিয় রোম ক্যাভালিয়েরি এখনও পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে। এখানেই রয়েছে শহরের একমাত্র তিন মিশেলিন-তারকাপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁ লা পারগোলা।
যাতায়াত আরও সহজ করতে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে মেট্রো লাইন সি। পাশাপাশি কলোসিয়াম ও পিয়াজ্জা ভেনেজিয়া এলাকার আশপাশ আরও পথচারীবান্ধব করা হচ্ছে।
রোমে গেলে অবশ্যই দেখতে হবে কলোসিয়াম, প্যানথিয়ন, ত্রেভি ফাউন্টেন এবং ইতালির বিখ্যাত জেলাটো।
ট্রিপঅ্যাডভাইজরের তালিকায় রোম তৃতীয় স্থানে রয়েছে। তবে ব্যয়ের দিক থেকে তিন শহরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে সাশ্রয়ী।
মাঝারি মানের রেস্তোরাঁয় দুইজনের তিন কোর্সের খাবারে যাবে আনুমানিক ৮ হাজার ৬০০ টাকা।
স্থানীয় পরিবহনে একমুখী ভাড়া পড়ে ২১৫ থেকে ২২০ টাকা।
ভরে মৌসুমে তিন তারকা হোটেলের গড় ভাড়া ৩৬ হাজার টাকার মতো।
কোন শহর আপনার জন্য?
যদি ইতিহাস, বিশ্বমানের জাদুঘর, থিয়েটার এবং আধুনিক নগরজীবন পছন্দ করেন, তাহলে লন্ডন হতে পারে সেরা পছন্দ।
রোমান্টিক পরিবেশ, শিল্প, সংস্কৃতি ও খাবারের জন্য প্যারিসের জুড়ি নেই।
আর প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন, হাজার বছরের ইতিহাস এবং তুলনামূলক কম খরচে ইউরোপ ভ্রমণ করতে চাইলে রোম হতে পারে সবচেয়ে ভালো বিকল্প।