প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রাণীগুলোর একটি নীল তিমি। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩০ মিটার, ওজনে ১৫০ টনের কাছাকাছি এই বিশাল স্তন্যপায়ী প্রাণীকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ খুব কম দেশেই পাওয়া যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় এমন এক গন্তব্য আছে, যেখানে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নীল তিমির দেখা মেলে নিয়মিত। সেটি হলো শ্রীলঙ্কা। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসকে ধরা হয় নীল তিমি দেখার সবচেয়ে আদর্শ সময়।
শ্রীলঙ্কার চারপাশের গভীর সমুদ্র অঞ্চল নীল তিমির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। উপকূল ঘেঁষেই গভীর সমুদ্র থাকায় খুব বেশি দূরে না গিয়েই তিমি দেখার সুযোগ পাওয়া যায়। দেশটির উপকূলে ফিন হোয়েল, স্পার্ম হোয়েল, হাম্পব্যাক হোয়েলসহ প্রায় ১০ প্রজাতির তিমি দেখা যায়। তবে সবচেয়ে আকর্ষণ নীল তিমি, যাকে বলা হয় সাগরের রাজা।
ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময় শ্রীলঙ্কার উপকূলে নীল তিমির উপস্থিতি বাড়ে। এ সময় সাগরে ‘ক্রিল’ নামের একধরনের ক্ষুদ্র চিংড়ি জাতীয় প্রাণীর আধিক্য থাকে, যা নীল তিমির প্রধান খাদ্য। খাবারের খোঁজেই বিশাল এই প্রাণীরা ভারত মহাসাগরের গভীর জল ছেড়ে উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে।
নীল তিমি দেখার জন্য শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা দক্ষিণ উপকূলের মিরিসা। মিরিসার বিশেষত্ব হলো এখানকার মহীসোপান বা সমুদ্রতল খুব দ্রুত গভীর হয়ে যায়। ফলে হারবার থেকে কিছুদূর এগোলেই তিমির বিচরণ এলাকায় পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। কলম্বো থেকে ট্রেন বা বাসে সহজেই মিরিসা কিংবা পাশের গালে পৌঁছানো যায়।
সাধারণত ভোর ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে মিরিসা হারবার থেকে বোট ছাড়ে। সমুদ্রযাত্রা চলে প্রায় ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা। এই সময়ে পর্যটকেরা বোটের ওপরে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়ের দৃশ্য উপভোগ করেন এবং দিগন্তজুড়ে নীল জলরাশির মাঝে হঠাৎ ভেসে ওঠা বিশাল তিমির খোঁজ করেন। ভাগ্য ভালো হলে পানির ওপর ভেসে ওঠা নীল তিমির পিঠ, শ্বাস নেওয়ার সময় পানির ফোয়ারা কিংবা বিশাল লেজের আছড়ে পড়ার দৃশ্য দেখা যায়।
বোট ট্যুরগুলো সাধারণত পর্যটকদের নিরাপত্তা ও আরামের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত হয়। প্রতিটি বোটে লাইফ জ্যাকেট, ফার্স্ট এইড কিট ও অভিজ্ঞ ক্রু থাকে। অনেক ট্যুরে হালকা নাশতার ব্যবস্থাও থাকে। তবে সমুদ্রযাত্রার জন্য সানস্ক্রিন, টুপি, আরামদায়ক পোশাক এবং ক্যামেরা সঙ্গে রাখা ভালো।
ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া ভ্রমণের জন্য বেশ অনুকূল। দক্ষিণ ও পশ্চিম উপকূলে এ সময় বৃষ্টি খুব কম হয়, আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং তাপমাত্রা সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। ফলে সমুদ্রযাত্রা যেমন আরামদায়ক হয়, তেমনি সৈকত কিংবা পাহাড়ি এলাকাও ঘুরে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।
তবে ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কার পর্যটনের পিক সিজন। ফলে হোটেল, রিসোর্ট ও ট্যুরের খরচ তুলনামূলক বেশি থাকে এবং জনপ্রিয় জায়গাগুলোতে ভিড়ও বেশি দেখা যায়। তাই আগেভাগে বুকিং দিলে ভ্রমণ সহজ হয়। পাশাপাশি তিমি দেখার সময় দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। তিমির খুব কাছাকাছি না যাওয়া, শব্দ না করা এবং সমুদ্রে কোনো ধরনের বর্জ্য না ফেলা পরিবেশ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।