বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা খাতে ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতাও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে কম খরচ, উন্নত সেবা কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষা এড়াতে প্রতি বছর লাখো মানুষ অন্য দেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া মেডিকেল ট্যুরিজম ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মার্কিন নাগরিক চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশ সফর করেন। কসমেটিক সার্জারি, প্রজনন চিকিৎসা, ডেন্টাল কেয়ার থেকে শুরু করে জটিল অস্ত্রোপচার পর্যন্ত নানা কারণে এই প্রবণতা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকেই শুধু কম খরচের জন্য নয়, উন্নত মানের চিকিৎসা কিংবা নিজ দেশে দীর্ঘ অপেক্ষার বিকল্প হিসেবেও বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

মেডিকেল ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও সহপ্রতিষ্ঠাতা জোনাথন এডেলহেইট বলেন, অনেক রোগী দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার জন্য বিদেশমুখী হন। আবার কেউ কেউ উন্নত চিকিৎসা বা সাশ্রয়ী ব্যয়ের সুযোগ খোঁজেন।

বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার জরুরি

বিদেশে চিকিৎসার পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সঠিক হাসপাতাল ও চিকিৎসক নির্বাচন। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা খুঁজতে গেলে অসংখ্য বিকল্প সামনে আসে, যা অনেকের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন রিভিউ দেখা শুরুতে সহায়ক হলেও শুধু সেটির ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। চিকিৎসকের যোগ্যতা, হাসপাতালের স্বীকৃতি এবং আগের রোগীদের অভিজ্ঞতা যাচাই করাও জরুরি।

জোনাথন এডেলহেইটের পরামর্শ, সম্ভব হলে আগের রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা উচিত। এতে চিকিৎসাসেবার মান সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়।

বিদেশে চিকিৎসাসেবা খুঁজতে বর্তমানে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কাজ করছে। এর মধ্যে মেডিকেল ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের ‘বেটার’ প্ল্যাটফর্মটি আলোচনায় রয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে রোগীরা হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ, চিকিৎসা ব্যয়ের কোটেশন সংগ্রহ এবং মেডিকেল রেকর্ড আদান-প্রদান করতে পারেন।

নগদ নয়, কার্ডে পরিশোধের পরামর্শ

বিদেশে চিকিৎসার অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা নগদ লেনদেন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।

জোনাথন এডেলহেইট বলেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে প্রতারণা বা আর্থিক জটিলতার ক্ষেত্রে কিছু সুরক্ষা পাওয়া যায়। অনেক সময় কিছু প্রতিষ্ঠান কর এড়াতে নগদ অর্থ নিতে চায়, যা রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, উচ্চ সুদের কারণে ক্রেডিট কার্ডে বড় অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয় বহন করাও ঝুঁকির হতে পারে। তাই অর্থ পরিশোধের আগে সুদের হার ও কিস্তি সুবিধা ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কিছু প্ল্যাটফর্ম আবার কিস্তিভিত্তিক অর্থায়নের সুবিধাও দিচ্ছে, যা রোগীদের ব্যয় সামলাতে সহায়তা করছে।

ভ্রমণ বিমা ছাড়া বাড়তে পারে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলে সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়গুলোর একটি হলো বিমা সুরক্ষা।

সাধারণ ভ্রমণ বিমা অনেক সময় মেডিকেল ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে কার্যকর হয় না। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ স্বাস্থ্যবিমাও বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় কভার করে না।

ফলে অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসাজনিত জটিলতা তৈরি হলে রোগীদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সা পার্টনারসের কর্মকর্তা গ্লেন ইভানস বলেন, চিকিৎসার পর জটিলতা তৈরি হলে অতিরিক্ত খরচের জন্য রোগীদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

বর্তমানে কিছু বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান মেডিকেল ট্যুরিজমের জন্য আলাদা জটিলতা বিমা সুবিধা দিচ্ছে। এসব বিমা চিকিৎসার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জটিলতা, ভ্রমণ বিলম্ব বা সফর বাতিলজনিত ক্ষতিও কভার করতে পারে।

পরিকল্পনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসকের লাইসেন্স যাচাই, হাসপাতালের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা, চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপ পরিকল্পনা এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা।

এ ছাড়া মেডিকেল রেকর্ডের কপি, প্রয়োজনীয় ভিসা, ভ্রমণ বিমা ও আর্থিক পরিকল্পনাও আগেভাগে সম্পন্ন করা উচিত বলে পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।