কাওলুন ওয়াল্ড সিটি ছিল অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এক আবাসভূমি, যেখানে হাজারো মানুষ বসবাস করলেও সেটি কার্যত ছিল নিয়ন্ত্রণহীন ও আইনশৃঙ্খলাহীন। এমনকি পুলিশও এর ভেতরে প্রবেশ করতে ভয় পেত। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে জন্ম নেওয়া এই অনন্য কাওলুন ওয়াল্ড সিটি ছিল ব্রিটিশ-শাসিত হংকংয়ের ভেতরে এক আলাদা জগৎ। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও এটি পুরনো হংকংয়ের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অপরাধপ্রবণতা থাকা সত্ত্বেও এর অদ্ভুত আকর্ষণের কারণে আজও অনেকে জায়গাটিকে নস্টালজিয়ার সঙ্গে স্মরণ করেন।

এর সূচনা হয়েছিল সং রাজবংশ আমলের একটি দুর্গ হিসেবে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি ধীরে ধীরে আজকের পরিচিত রূপ নিতে শুরু করে। যদিও এলাকা ছিল ব্রিটিশ ভূখণ্ডের অংশ। তবে চীনের কর্মকর্তারা এটিকে নিজেদের দাবি করতেন।

১৯৪৫ সালে চীনা গৃহযুদ্ধের পর সেখানে দখলদার বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যে বাসিন্দার সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়।
ব্রিটিশ প্রশাসন ওয়াল্ড সিটির ব্যাপারে ‘হ্যান্ডস-অফ’ (হস্তক্ষেপ না করার) নীতি গ্রহণ করে। অর্থাৎ, কার্যত সেখানে ব্রিটিশ বা চীনা কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই প্রবেশ করত না। কেবল মাঝে মাঝে হংকং পুলিশ ফোর্স অভিযান চালাত।

পরের দশকের শুরুতেই এটি অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। মাদক, পতিতাবৃত্তি ও জুয়ার বিস্তার ঘটে। এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিভিন্ন অপরাধচক্রের হাতে। 
আইনের কার্যকর হস্তক্ষেপ না থাকায় আবাসন বা ভবন নির্মাণবিধির কোনো তোয়াক্কা ছিল না। পুরনো ভবনের ওপর নতুন কাঠামো গড়ে উঠতে থাকে, যেখানে সামান্য জায়গা পাওয়া গেছে, সেখানেই নির্মাণ হয়েছে। ফলে শহরটি কেবল ওপরের দিকে বাড়তে থাকে। 
১৯৭০ এর দশকের শেষদিকে কাওলুন ওয়াল্ড সিটি তার সর্বোচ্চ আকারে পৌঁছায় এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়। মাত্র ২ দশমিক ৬ হেক্টর এলাকার ৩০০টি ভবনে বাস করত ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ।

সংখ্যাটি বোঝাতে গেলে, প্রতি বর্গকিলোমিটারে সেখানে বাস করত প্রায় ১২ লাখ মানুষ। বর্তমানে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর ম্যানিলাতেও প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৪ হাজারের মতো মানুষ বসবাস করে। 
শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য সরু গলি। বেশির ভাগ গলি ছিল এক থেকে দুই মিটার প্রশস্ত। মানবদেহের ধমনির মতো এগুলো পুরো এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল।
নিষ্কাশনব্যবস্থা ও আলোর অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। কোনো পরিকল্পিত মানচিত্র না থাকায় বাইরের মানুষের কাছে এটি ছিল গোলকধাঁধার মতো। অনেক ভবনেই বিদ্যুৎ বা অন্যান্য মৌলিক সেবা ছিল না; অনেকে অন্য জায়গা থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিত।
১৯৮৭ সালে শহরটি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হয় এবং ১৯৯৪ সালের এপ্রিল নাগাদ কাওলুন ওয়াল্ড সিটির আর কোনো অস্তিত্ব থাকেনি। এর জায়গায় গড়ে তোলা হয় কাওলুন ওয়াল্ড সিটি পার্ক— একটি খোলা সবুজ পার্ক, যা আগের পরিবেশের সম্পূর্ণ বিপরীত।

কাওলুন ওয়াল্ড সিটিকে এত অবিশ্বাস্য করে তুলেছিল এর চেহারা। ভবনগুলো এত ঘনভাবে একে অপরের সঙ্গে লেগে ছিল যে পুরো জায়গাটিকে একটি বিশাল কঠিন কাঠামোর মতো মনে হতো, কংক্রিট ও ধাতুর জটিল সংমিশ্রণ। করিডর, সিঁড়িঘর ও গলিগুলো এটিকে গোলকধাঁধায় পরিণত করেছিল। পুরো এলাকা ছিল অপরিচিত, দুর্ভেদ্য এবং পৃথিবীর অন্য যেকোনো জায়গা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
সূর্যের আলো প্রায় ঢুকতেই পারত না। ফলে স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, খোলা পাইপ ও জট পাকানো তারগুলো সারাক্ষণ উজ্জ্বল ফ্লুরোসেন্ট বাতির আলোয় আলোকিত থাকত।

বলা হয়, ওয়াল্ড সিটির ভেতরের বাতাসও ছিল আলাদা, বাইরের তুলনায় ভারী। সেখানে মিশে থাকত হাজারো মানুষের রান্নার গন্ধ, আবর্জনার দুর্গন্ধ এবং ছোট ছোট শিল্পকারখানার নানা গন্ধ। শিশুরা খেলতে চাইলে ছাদে যেত। পাশের কাই তাক বিমানবন্দরের কারণে ভবনের উচ্চতা ১৪ তলার বেশি হতে পারত না। সেই ছাদেই তারা অবশেষে সূর্যের আলো অনুভব করতে পারত এবং স্বাভাবিক শিশুর মতো খেলাধুলা করত।
জীবন্ত কোনো প্রাণীর মতোই ওয়াল্ড সিটি ছিল কোলাহলপূর্ণ। যন্ত্রের অবিরাম শব্দ আর বাসিন্দাদের কণ্ঠস্বর ছিল এর হৃদস্পন্দনের মতো। কাছের বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করা বিমানের শব্দ ছিল প্রায় স্থায়ী পটভূমি।

ধ্বংসের পর থেকে কাওলুন ওয়াল্ড সিটির কিংবদন্তি আরও বেড়েছে। সময়ের সঙ্গে এর অনিরাপদ ও নিম্নমানের জীবনযাপনকে অনেকেই রোমান্টিকভাবে দেখাতে শুরু করেছেন। তবুও একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, এটি ছিল জীবন্ত একটি সমাজ, যেখানে মানুষের জীবন গড়ে উঠেছে, বদলেছে, হারিয়েও গেছে। 
এখন সেটি কেবল স্মৃতিতে বেঁচে আছে চরম ঘনবসতির নগর আর মানুষের চরম অভিযোজন ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে।