তাইওয়ানের খাবার, ভ্রমণ, ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও নিষিদ্ধ প্রেমের অনন্য বয়ানে লেখা উপন্যাস তাইওয়ান ট্রাভেলগ জিতেছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মান ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কার। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মান্দারিন চীনা ভাষা থেকে অনূদিত কোনো উপন্যাস এই পুরস্কার অর্জন করল।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের লেখক ইয়াং শুয়াং-জি রচিত এবং তাইওয়ানিজ-আমেরিকান অনুবাদক লিন কিং অনূদিত উপন্যাসটি ১৯৩০-এর দশকের তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে নির্মিত। সে সময় দ্বীপটি জাপানি শাসনের অধীনে ছিল।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন কাল্পনিক জাপানি লেখক আওয়ামা চিজুকো। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি তাইওয়ান সফরে যান। তার সফরসঙ্গী ছিলেন তাইওয়ানিজ অনুবাদক ও চিজুরু। একসঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রেমে রূপ নেয়।
দুই নারীর এই খাদ্যভ্রমণের মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি প্রেম, সংস্কৃতি, ঔপনিবেশিকতা ও ক্ষমতার জটিল সম্পর্ককে অনুসন্ধান করেছে। একই সঙ্গে এতে উঠে এসেছে জাপানি শাসনের সময়কার তাইওয়ানের সামাজিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন।
উপন্যাসটির নির্মাণশৈলীও পাঠকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। বইটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যেন বহু বছর পর খুঁজে পাওয়া কোনো পুরোনো ভ্রমণস্মৃতির অনুবাদ এটি। কল্পিত ফুটনোট এবং নথিপত্রের ব্যবহার বইটিকে আরও বাস্তবধর্মী করে তুলেছে। ২০২০ সালে প্রকাশের পর অনেক পাঠক এটিকে বাস্তব ঐতিহাসিক দলিল বলেও মনে করেছিলেন।
ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কারের বিচারক প্যানেলের চেয়ারম্যান নাটাশা ব্রাউন উপন্যাসটিকে “মুগ্ধকর এবং সূক্ষ্ম বুদ্ধিদীপ্ত” বলে মন্তব্য করেছেন।
পুরস্কার ঘোষণার আগে ইয়াং শুয়াং-জি বুকার কর্তৃপক্ষকে বলেন, “ভ্রমণ ও খাবার এই দুই বিষয় নিয়ে গবেষণা আমার জীবনে দুটি পরিবর্তন এনেছে। আমার সঞ্চয় কমেছে, আর ওজন বেড়েছে।”
৪১ বছর বয়সী এই লেখক প্রবন্ধ, মাঙ্গা এবং ভিডিও গেমের চিত্রনাট্যও লেখেন। উপন্যাসটির মূল মান্দারিন সংস্করণ ২০২১ সালে তাইওয়ানের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ‘গোল্ডেন ট্রাইপড অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে।
অন্যদিকে লিন কিংয়ের ইংরেজি অনুবাদ ২০২৪ সালে ‘ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেটেড লিটারেচার’ জিতে নেয়। পুরস্কার ঘোষণার আগে তিনি বলেন, জাপানি শাসনের অধীনে থাকা তাইওয়ানের মানুষের দুঃখ ও আনন্দকে উপন্যাসটি অত্যন্ত ভারসাম্যের সঙ্গে তুলে ধরেছে।
তার ভাষায়, “সময় যত কঠিনই হোক, মানুষ সবসময়ই হাসি আর গভীর ভালোবাসার আশ্রয় খুঁজে নেয়।”
তিনি আরও বলেন, “সেই সময়েও ছিল হাস্যরস, সুস্বাদু খাবার, সিনেমা, স্কুল, ছোটখাটো ঝগড়া আর প্রেম। একটি সংস্কৃতিকে শুধু তার ট্র্যাজেডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়।”
বুকার কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে অনুবাদের “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার” প্রশংসা করেছে। পুরস্কারের ৫০ হাজার পাউন্ড অর্থমূল্য লেখক ও অনুবাদকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে।