খেলাধুলা সাধারণত খুব একটা বিপজ্জনক হয় না; বড়জোর অফিস শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে পেশিতে টান পড়তে পারে, কিংবা ছুটির সকালে কিছুটা দৌড়ানোর সময় গোড়ালি মচকে যেতে পারে—ঝুঁকি বলতে এটুকুই।
গলফের ক্ষেত্রে তো এটি আরও বেশি সত্যি। এটি এতটাই নিরাপদ একটি খেলা যে, একে মধ্যম সারির কর্মকর্তা আর অবসরপ্রাপ্তদের একচেটিয়া বিনোদন হিসেবে ধরা হয়।
একে অলস সকালে স্থানীয় ক্লাবে হেঁটে হেঁটে সময় কাটানো হিসেবেও দেখা যেতে পারে। পকেটের ওপর যে ধকল যায়, তা বাদ দিলে এই খেলা একদমই নিরীহ।
লেখক মার্ক টোয়েন যেমনটি মন্তব্য করেছিলেন, গলফ হলো ‘একটি সুন্দর হাঁটার অভিজ্ঞতাকে নষ্ট করা’।
তবে সব ক্ষেত্রে এ কথা খাটে না। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্ত এলাকাটি এই গ্রহের অন্যতম বিপজ্জনক ক্রীড়াঙ্গন এবং প্রায় নিশ্চিতভাবেই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক গলফ কোর্স।
প্রথম দেখায় ক্যাম্প বোনিফাসকে একটি সামরিক ফাঁড়ি ভেবে ভুল করলে কাউকে দোষ দেওয়া যাবে না।
জায়গাটি এমন যেখানে গলফ ক্লাবের দূরত্ব মাপার চেয়ে স্নাইপার রাইফেলের স্কোপ ঠিক করার জন্য রেঞ্জ ফাইন্ডার ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি।
পৃথিবীর অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ, কঠোর পাহারাবেষ্টিত এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকা 'কোরীয় বেসামরিকীকরণ অঞ্চলে' (ডিএমজেড) অবস্থিত এই কোর্সটি আর দশটা সাধারণ কোর্সের মতো নয়।
আর এই কারণেই এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক গলফ খেলার জায়গার খেতাব পেয়েছে। আপনার যদি মনে হয় 'অগাস্টা ন্যাশনাল' গলফ কোর্সের নিয়মকানুন খুব কড়া, তবে ভাবুন ক্যাম্প বোনিফাসে খেলা কতটা রোমাঞ্চকর ও তীব্র হতে পারে।
এখানে গলফ ক্লাব হাতে নিলেই সশস্ত্র সেনারা আপনাকে চোখে চোখে রাখবে। আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া বল খুঁজতে গেলে গুলি খাওয়ার কিংবা ল্যান্ডমাইনের ওপর পা পড়ার ঝুঁকিও থাকবে।
ক্যাম্প বোনিফাস পৃথিবীর অন্য যেকোনো গলফ কোর্সের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কোনো ক্লাবহাউস নেই, নেই কোনো ১৮টি হোল (গর্ত); পুরো কোর্সে রয়েছে মাত্র একটি একক হোল, আর সেটিরও কোনো উপযুক্ত ফেয়ারওয়ে বা মসৃণ মাঠ নেই।
এই হোলটি ১৯২ গজের, যা পৃথিবীর অন্য যেকোনো জায়গায় খুবই সাধারণ একটি 'পার থ্রি' (তিন শটে বল ফেলার মাঠ) হতো। কিন্তু অন্য সাধারণ কোর্সের মতো না হয়ে এটি তৈরি হয়েছে রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চলে এবং এর চারপাশে রয়েছে ঘন জঙ্গল। আর সেখানে লাগানো সাইনবোর্ডগুলো মনে করিয়ে দেয় যে, এটি একটি সক্রিয় মাইনফিল্ড।
এটি এমন কোনো জায়গা নয় যেখানে আপনি শট নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইবেন। কারণ বল যদি ঘন ঝোপের মধ্যে চলে যায়, তবে সেটি কুড়িয়ে আনার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া, একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট বলের আঘাতে যদি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরিত হয়, তবে এই অস্থির অঞ্চলে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
১৯৭৬ সালে উত্তর কোরীয় সেনাবাহিনীর হাতে নিহত মার্কিন সেনা ক্যাপ্টেন আর্থার বোনিফাসের নামানুসারে এই ক্যাম্পের নামকরণ করা হয়। গাছের ডাল ছাঁটা নিয়ে সামান্য তর্কাতর্কি থেকে শুরু হওয়া এক উত্তেজনার জেরে তিনি খুন হয়েছিলেন।
এটি এখনো পুরোপুরি একটি সামরিক এলাকা। এই কোর্সে কেবল ক্যাম্পে দায়িত্বরত সেনা কর্মকর্তা অথবা আমন্ত্রিত সাংবাদিক ও বিশেষ অতিথিরাই খেলার সুযোগ পান।
প্রায়ই বলা হয় গলফ হলো মনের খেলা, আর ক্যাম্প বোনিফাসের এই একটি হোলে খেললে সেই যুক্তির সত্যতা পুরোপুরি মেলে। যখন একটি সামান্য ভুলেই আক্ষরিক অর্থে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, তখন নিখুঁত শট নেওয়ার গুরুত্ব সহজেই বোঝা যায়।
আপনি যখন বলটি হোলে ফেলার শেষ চেষ্টা (পুট) করছেন, তখন হয়তো ডিএমজেড-এর ওপার থেকে উত্তর কোরিয়ার প্রহরীরা আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাতাসে ভেসে আসছে উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক প্রচারণামূলক মাইকের শব্দ।
যেখান থেকে শট নেওয়া শুরু হয় (টি বক্স), সেটি নিজেই তৈরি হয়েছে একটি পরিত্যক্ত মেশিনগান বাঙ্কারের ওপর। ফলে এই খেলার মাঠ এবং এর যুদ্ধংদেহী অবস্থানকে আলাদা করার কোনো উপায় নেই, যা এটিকে নিঃসন্দেহে এই গ্রহের সবচেয়ে বিপজ্জনক গলফ কোর্স করে তুলেছে।