কক্সবাজার রুটে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত এক বছরে এই রুটে অন্তত ৩৮ বার পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন ১৪ জন যাত্রী। সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর পর্যটক এক্সপ্রেস। কেন এই ট্রেনটিই দুর্বৃত্তদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
সর্বশেষ গত ২৭ এপ্রিল কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেসে’ পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হন দুই যাত্রী। দিনাজপুরের বিরামপুর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়া হিমেল আহমেদ (২৫) ও আবু সাঈদ (৪০) ফেরার পথে হামলার শিকার হন। ট্রেনটি চকরিয়া এলাকা অতিক্রম করার সময় বাইরে থেকে ছুড়ে মারা পাথরে হিমেলের মুখ রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং তার চারটি দাঁত ভেঙে যায়। আরেকটি পাথরে ঘাড়ে আঘাত পান সাঈদ। পরে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ট্রেনে অন্তত ১৪৫ বার পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৯ জন। পাশাপাশি ট্রেনের দরজা-জানালারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
রেল কর্মকর্তারা বলছেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচের জানালা সাধারণত বন্ধ থাকে। কিন্তু সাধারণ বগির যাত্রীরা বাইরের দৃশ্য দেখতে কিংবা বাতাস নেওয়ার জন্য জানালা খোলা রাখেন। এ সুযোগেই দুর্বৃত্তরা চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারে। ফলে জানালার পাশে বসা যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
বিশেষ করে চকরিয়া ও রামু এলাকায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটে। রেলওয়ের ভাষ্য, এসব এলাকার নির্জন স্থানকে টার্গেট হিসেবে বেছে নেয় দুর্বৃত্তরা। অনেক ক্ষেত্রে বখাটেদের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদেরও এ ঘটনায় জড়িত থাকতে দেখা যায়।
গত মার্চের প্রথম ১৩ দিনেই পর্যটক এক্সপ্রেসে ছয়বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ১৪ মার্চ রাতে রামু স্টেশন ছাড়ার কিছুক্ষণ পর দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরে আহত হয় অর্ণন চৌধুরী নামে এক বছরের এক শিশু। এর আগে ২ মার্চ রাতে চকরিয়ার ডুলাহাজারা স্টেশন এলাকায় পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হন রেলের বেডিং পোর্টার ছাবের আহমদ (৫২)। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা তার মাথায় ১০টি সেলাই দেন।
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নতুন নয়। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে চলন্ত ট্রেনে পাথরের আঘাতে নিহত হন প্রকৌশলী প্রীতি দাশ। ওই ঘটনার পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। এরপরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একটি গুরুতর অপরাধ। ট্রেনের ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে এ ধরনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হলে ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে রেলওয়ে। রেললাইনের আশপাশের স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় শিশু-কিশোরদের মধ্যে পাথর নিক্ষেপের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন পরিদর্শনের সময় যেসব এলাকায় বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, সেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সবুক্তগীন বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ প্রতিরোধে রেলওয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। জনসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, মসজিদের ইমাম ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টাও চলছে।