পদ্মা সেতু শুধু দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেনি, এর আশপাশের জনপদেও সৃষ্টি করেছে নতুন অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা। ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে সেই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে। প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে পদ্মাপাড়, আর সেই ভিড়কে কেন্দ্র করে বাড়ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
একসময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে ঈদ কিংবা দীর্ঘ ছুটির ভ্রমণ মানেই ছিল ফেরিঘাটের দীর্ঘ অপেক্ষা, নদী পারাপারের অনিশ্চয়তা এবং দুর্ভোগ। মাওয়া, কাঠালবাড়ি ও মাঝীরঘাট ছিল সেই ভোগান্তির পরিচিত নাম। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর বদলে গেছে সেই বাস্তবতা। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মানুষের যাতায়াত যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে নতুন পর্যটন গন্তব্যও।
ঈদের ছুটিতে জাজিরা প্রান্তে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন পদ্মা সেতু ও পদ্মা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে। সেতুর জাজিরা প্রান্ত, নদীতীরবর্তী বেড়িবাঁধ, পুনর্বাসন এলাকা, বৃক্ষায়ন প্রকল্প, সেতুর নিচের অংশ এবং আশপাশের খোলা প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পদ্মাপাড়জুড়ে থাকে উৎসবমুখর পরিবেশ। কেউ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। অনেকেই পদ্মা সেতুকে পটভূমি করে ছবি তুলে স্মরণীয় মুহূর্ত ধরে রাখছেন।
পর্যটকদের এই ভিড়কে ঘিরে নদীতীরে গড়ে উঠেছে ফুচকা, চটপটি, ভাজাপোড়া, বাদাম, খেলনা ও বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী দোকান। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় বাড়ছে। পাশাপাশি পরিবহন, নৌভ্রমণ এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জিহাদুল ইসলাম সুমন বলেন, একসময় শরীয়তপুরকে মানুষ মূলত নদীভাঙনের জেলা হিসেবেই চিনত। এখন পদ্মা সেতুর কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে ঘুরতে আসে। এতে স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে জাজিরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
পদ্মা সেতু চালুর ফলে যাত্রী পারাপার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেক স্পিডবোট ও ট্রলার মালিক নতুনভাবে পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। মাঝীরঘাট এলাকার স্পিডবোট মালিক হারুন খান বলেন, আগে নদী পারাপারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতাম। সেতু চালুর পর সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এখন পর্যটকদের নিয়ে নদীতে ভ্রমণের ব্যবস্থা করে জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছি।
মাদারীপুর থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা ফয়সাল আহমেদ বলেন, পদ্মা সেতু, পদ্মা নদী এবং আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসঙ্গে উপভোগ করা যায় বলেই এখানে আসা। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য স্থানটি বেশ আনন্দদায়ক।
জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান বলেন, ঈদের ছুটিতে এখানে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আনসার সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে ভবিষ্যতে এলাকাটি একটি সুসংগঠিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পদ্মা সেতুর ডান তীর সংরক্ষণ বাঁধের কয়েকটি স্থানে নদীভাঙনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে দ্রুত কার্যকর নদীভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নদীতীর সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা গেলে জাজিরা শুধু পদ্মা সেতুর প্রবেশদ্বার হিসেবেই নয়, দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
একসময় যে পদ্মা নদী মানুষের দুর্ভোগ ও শঙ্কার প্রতীক ছিল, আজ সেই নদীকেই ঘিরে জাজিরায় গড়ে উঠছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। দর্শনার্থীদের পদচারণা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য এ অঞ্চলের পরিবর্তনের নতুন গল্প বলছে।