বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় আয়োজিত ‘প্লাস্টিকমুক্ত কুয়াকাটা ২০২৬’ কর্মসূচিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কর্মসূচির টি-শার্ট, ক্যাপ ও প্রচারসামগ্রীতে কুয়াকাটার নিজস্ব কোনো প্রতীক বা মনোগ্রামের পরিবর্তে কক্সবাজারের পরিচিত ঐতিহ্য ‘সাম্পান’-এর ছবি ব্যবহার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পরিবেশকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা।
শুক্রবার (৫ জুন) বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘সুইচ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ ও ‘COALS Global’-এর যৌথ উদ্যোগে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে অনুষ্ঠিত হয় ‘প্লাস্টিকমুক্ত কুয়াকাটা ২০২৬’ শীর্ষক পরিচ্ছন্নতা অভিযান। আয়োজকদের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
অভিযানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহ করেন। তবে কর্মসূচির প্রচারসামগ্রীতে কুয়াকাটার পরিচিত কোনো প্রতীক বা সমুদ্র সৈকতের ছবি না থাকায় স্থানীয়দের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, ‘প্লাস্টিকমুক্ত কুয়াকাটা’ স্লোগানে আয়োজন করা হলেও কর্মসূচিতে ব্যবহৃত ব্যানার, ফেস্টুন, পানির বোতল ও অন্যান্য উপকরণে প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে। একই সঙ্গে কুয়াকাটার নামে আয়োজিত কর্মসূচিতে কুয়াকাটার নিজস্ব ব্র্যান্ডিং অনুপস্থিত থাকাকে অনেকে অবহেলা কিংবা পরিকল্পিত ভুল হিসেবে দেখছেন।
কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম বাচ্চু বলেন, "কুয়াকাটা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য। এখানে পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচি আয়োজন অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে আজকের প্রোগ্রামে তারা মুখে প্লাস্টিকমুক্ত বললেও বাস্তবে প্লাস্টিকের পানির বোতলসহ অন্যান্য প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার করেছে। তাছাড়া কুয়াকাটার পরিচিতি তুলে ধরার পরিবর্তে কক্সবাজারের প্রতীক ব্যবহার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। ভবিষ্যতে আয়োজকদের এ বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া উচিত।" কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইব্রাহিম ওয়াহিদ বলেন, "পরিবেশ রক্ষায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে ‘প্লাস্টিকমুক্ত কুয়াকাটা’ নামে আয়োজিত কর্মসূচিতে কুয়াকাটার নিজস্ব কোনো প্রতীক বা পরিচিতি না রেখে কক্সবাজারের সাম্পানের ছবি ব্যবহার করায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কুয়াকাটার নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটন পরিচিতিকে সামনে রেখেই এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করা উচিত ছিল। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ সচেতনতা বাড়ত, অন্যদিকে কুয়াকাটার ব্র্যান্ডিংও আরও শক্তিশালী হতো।" কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও হোটেল সমুদ্র বিলাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ইসমাইল ইমন বলেন, "কুয়াকাটাকে ব্র্যান্ডিং করার বড় একটি সুযোগ ছিল এই আয়োজন। কিন্তু প্রচারসামগ্রীতে কুয়াকাটার কোনো পরিচয় না রেখে অন্য এলাকার প্রতীক ব্যবহার করায় পর্যটনসংশ্লিষ্টরা হতাশ হয়েছেন। বিষয়টি আয়োজকদের নজরে আনা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুইচ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মুইনুল আহসান ফয়সাল বলেন, "আমরা মূলত কুয়াকাটার পরিচিত প্রতীক লাল কাঁকড়া এবং স্থানীয় ফিশিং ট্রলারগুলোকে ব্র্যান্ডিংয়ের আওতায় আনতে ছবিটি ব্যবহার করেছি। এর পেছনে আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আর সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের কারণে আমরা পলিথিন ও প্লাস্টিকের কিছু উপকরণ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি। বিষয়টি পরিবেশগতভাবে কতটা সংবেদনশীল, সে বিষয়ে আগে থেকে যথাযথভাবে অবগত করা হলে হয়তো এই অনিচ্ছাকৃত ভুলটি হতো না। আমরা ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকব এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদ বলেন, "এই প্রোগ্রামটি সরকারি হলে আমাদের শতভাগ নজরদারি থাকত। এটি বেসরকারি প্রোগ্রাম হওয়ায় তাঁদের কাজ সম্পর্কে আমরা আগে থেকে অবগত ছিলাম না। তবে বিষয়টি এখন আমাদের নজরে এসেছে। আয়োজকদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করা হবে, যাতে ভবিষ্যতের কর্মসূচিগুলোতে কুয়াকাটার নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্য আরও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়।