বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপ্রেমীদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে নতুন এক প্রবণতা। শুধু দর্শনীয় স্থান দেখা বা অবকাশ যাপন নয়, বরং যত বেশি সম্ভব দেশ ভ্রমণের লক্ষ্য নিয়ে পথে নামছেন অনেকেই। ফলে ভ্রমণ এখন অনেকের কাছে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠছে ভ্রমণ করা দেশের সংখ্যা।
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপরাষ্ট্র টুভালু এই প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নয়টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে কম পরিদর্শিত দেশগুলোর অন্যতম। সেখানে সপ্তাহে সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালিত হয় এবং পর্যটন অবকাঠামোও তুলনামূলকভাবে অনুন্নত। রাজধানী ফুনাফুতির বিমানবন্দরের রানওয়ে বিকেলের পর স্থানীয়দের পিকনিক ও ফুটবল খেলার জায়গায় পরিণত হয়।
তবে এসব সীমাবদ্ধতা দেশভিত্তিক ভ্রমণে আগ্রহীদের নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। সম্প্রতি মার্কিন ভ্রমণকারী টেড নিমস টুভালু সফরের মাধ্যমে নিজের তালিকায় ১৯১তম দেশ যুক্ত করেছেন। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র ভ্রমণের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এখনও যাত্রা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনলাইন ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম নোম্যাডম্যানিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রেকর্ড ৮২ জন ভ্রমণকারী দাবি করেছেন যে তারা বিশ্বের ১৯৩টি দেশই ঘুরে দেখেছেন। এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে বিশ্বভ্রমণের প্রতি আগ্রহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
অবশ্য দেশ গণনার এই সংস্কৃতি নতুন নয়। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ট্রাভেলার্স সেঞ্চুরি ক্লাবে সদস্য হতে অন্তত ১০০টি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে সংগঠনটির সদস্যসংখ্যা প্রায় দুই হাজার। একই সঙ্গে নোম্যাডম্যানিয়া ও মোস্ট ট্রাভেলড পিপলের মতো ওয়েবসাইটে ভ্রমণকারীরা নিজেদের ভ্রমণ তালিকা প্রকাশ করছেন এবং অন্যদের সঙ্গে তুলনা করছেন।
মালয়েশিয়ার ভ্রমণকারী ক্যারল ওয়ং সম্প্রতি তাঁর ১৪২তম দেশ হিসেবে সামোয়া সফর করেছেন। তাঁর মতে, হোস্টেল বা স্থানীয় বাসস্থানে থাকার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকে আরও সামাজিক ও আনন্দদায়ক করে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ভ্রমণকারীদের মধ্যে তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেক পর্যটক এখন কম পরিচিত দেশ ও অঞ্চলের দিকে ঝুঁকছেন। ভ্রমণবিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্কিফটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিদর্শিত ১০টি দেশের আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমনের অংশীদারত্ব ১৯৮০ সালের প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে।
সিঙ্গাপুরের ভ্রমণকারী শ্যাং কিয়ান সং বলেন, তিনি এমন গন্তব্যে যেতে পছন্দ করেন, যেগুলো এখনো পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড়ে নিজেদের স্বকীয়তা হারায়নি। তাঁর মতো অনেকের কাছেই ভ্রমণ এখন শুধু অবকাশ যাপনের বিষয় নয়, বরং নতুন দেশ, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা আবিষ্কারের এক রোমাঞ্চকর অভিযানে পরিণত হয়েছে।