দিনাজপুরের পার্বতীপুরে একসময় ছিল জিগাগাড়ি নামের একটি জনবসতিপূর্ণ গ্রাম। মানুষের বসতি, কৃষিজমি আর গ্রামীণ জীবনের ব্যস্ততায় মুখর সেই এলাকা আজ বিশাল এক জলরাশিতে পরিণত হয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ভূগর্ভস্থ কার্যক্রমের কারণে ভূমি অবনমনের ফলে প্রায় ৪০০ একর এলাকা তলিয়ে যায়। সময়ের ব্যবধানে সেখানে সৃষ্টি হয় বড়পুকুরিয়া লেক, যা এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আলোচিত দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
দূর থেকে দেখলে লেকটির নীল জলরাশি যেন আকাশেরই প্রতিচ্ছবি। বর্ষা মৌসুমে এর সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। জলের বুকে ছোট ছোট ঢেউ, চারপাশের সবুজ প্রকৃতি এবং খোলা আকাশ মিলিয়ে তৈরি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। ফলে ছুটির দিন, ঈদ কিংবা উৎসবের সময় এখানে ভিড় করেন হাজারো দর্শনার্থী।
পার্বতীপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার এবং ফুলবাড়ী উপজেলা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে হামিদপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই লেক এখন প্রকৃতিপ্রেমী, ভ্রমণপিপাসু ও আলোকচিত্রপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় গন্তব্য। দর্শনার্থীরা নৌভ্রমণ, স্পিডবোটে ঘোরাঘুরি, জলকেন্দ্রিক বিনোদন এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতে এখানে আসেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় যেখানে মানুষের ঘরবাড়ি ছিল, সেখানে এখন শুধু জলরাশি। তবে অতীতের স্মৃতি হিসেবে এখনও দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট মসজিদ এবং কয়েকটি নারিকেল ও খেজুরগাছ। এগুলো যেন হারিয়ে যাওয়া গ্রামের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে জলাধারটির একটি অংশকে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করেছে। সেখানে বিভিন্ন দেশীয় ও বিলুপ্তপ্রায় মাছের সংরক্ষণ ও প্রজনন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে লেকটি শুধু বিনোদন বা পর্যটনের কেন্দ্র নয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দর্শনার্থীদের আকর্ষণ বাড়াতে লেকপাড়ে স্থানীয় উদ্যোক্তারা ছোট আকারের মেলা, নাগরদোলা, চরকি, ওয়াটার রোলার, বাঁশের সাঁকো এবং খাবারের দোকান গড়ে তুলেছেন। শিশু থেকে বয়স্ক, সব বয়সী মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে বিনোদনের সুযোগ।
ঘোড়াঘাট, বদরগঞ্জ, দিনাজপুর শহরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পর্যটকরা লেকটির সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, উত্তরাঞ্চলে এমন বিস্তীর্ণ জলাধার ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরল। অনেকেই এটিকে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেখছেন।
তবে পর্যটকদের দাবি, পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, আধুনিক স্যানিটেশন সুবিধা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র এবং প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিয়োগ করা হলে বড়পুকুরিয়া লেক আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। স্থানীয়দেরও বিশ্বাস, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি দেশের অন্যতম ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষের স্মৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন বড়পুকুরিয়া লেক। হারিয়ে যাওয়া একটি গ্রামের বেদনা ধারণ করেও এটি আজ নতুন সম্ভাবনা, পর্যটন এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশের প্রতীক হয়ে উঠছে।