পৃথিবীর যে দেশেই যান না কেন, আপনি শিশুদের ফুটবল খেলতে দেখবেন; সেই সঙ্গে দেখবেন এই সুন্দর খেলাটির জন্য অবশ্যই স্টেডিয়াম রয়েছে। ভ্রমণের মধ্যে অন্যতম একটা ব্যাপার হলো বিদেশের মাটিতে বসে একটা ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাশ্রয়ী বিমান ভ্রমণের কারণে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। কিন্তু ফুটবল সংস্কৃতি এখনো অসাধারণভাবে অনন্য ও বিশেষ।
স্টেডিয়ামের স্থাপত্য, গ্যালারির উন্মাদনা, দর্শকদের গাওয়া গান— প্রতিটি দেশেরই রয়েছে নিজস্ব ‘ফুটবল-ডিএনএ। আর সেটি সত্যিকার অর্থে অনুভব করা যায় কেবল নিজের চোখে দেখে।
বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে হাজার হাজার ফুটবল ম্যাচ দেখেছেন ভ্রমণ লেখক স্যাম ফার্লে।
যুক্তরাজ্যের ফার আউট সাময়িকীতে তিনি লিখেছে, “যখনই কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে ফুটবল দেখার জন্য বিশ্বের সেরা শহর কোনটি, আমার উত্তর একটাই—নাপোলি।
দক্ষিণ ইতালির কাম্পানিয়া অঞ্চলের রাজধানী নাপোলির জনসংখ্যা ১০ লাখের কম। এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বসবাসযোগ্য শহরগুলোর একটি। শহরটি প্রাচীন রোমান নগরী পম্পেই থেকে খুব বেশি দূরে নয়, যে নগরী একসময় মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে চাপা পড়েছিল।
ফার্লের ভাষায়, নাপোলির চেয়ে বেশি ক্লাব রয়েছে এমন শহর আছে, বেশি ট্রফি জিতেছে এমন শহরও আছে, আরও ব্যয়বহুল দলও রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর আর কোথাও ফুটবলকে নাপোলির মতো করে বাঁচিয়ে রাখা হয় না। এখানে ফুটবল কেবল বিনোদন বা সপ্তাহান্তের অবসর কাটানোর উপায় নয়; এটি একটি পরিচয়, প্রতিবাদ, শহরের প্রাণশক্তি এবং এখানকার মানুষের অস্তিত্বের অংশ।
নাপোলির বাসিন্দাদের হাতে হয়তো ইতালীয় পাসপোর্ট আছে, কিন্তু হৃদয়ে তারা নেপোলিটান।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ইতালি ও আর্জেন্টিনার ম্যাচ এই শহরেই হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়রা সমর্থন করেছিল অতিথি দল আর্জেন্টিনাকে, কারণ তাদের নায়ক ছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা এবং একই সঙ্গে নিজেদের দেশের প্রতি এক ধরনের হতাশাও কাজ করছিল।
প্রায়ই বলা হয়, ইতালির সরকার দেশের উত্তরাঞ্চলকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যেখানে বেশি অর্থ ও উন্নয়ন বরাদ্দ করা হয়। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলো নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছে, আর নাপোলি তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ।
ফুটবল ও নাপোলি নিয়ে কথা বলতে গেলে শুরুতেই ম্যারাডোনার কথা আসবে। মহান এই আর্জেন্টাইনকে শহরটিতে দেবতার মর্যাদা দেওয়া হয়। তিনি ১৯৮৪ সালে বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে নাপোলিতে যোগ দেন এবং মাত্র তিন বছর পর ক্লাবটিকে তাদের প্রথম স্কুডেত্তো (ইতালিয়ান লিগ শিরোপা) এনে দেন।
শহরের যেকোনো প্রান্তে হাঁটলেই তার মুখ দেখতে পাবেন। যাওয়ার আগে অনেকেই এ কথা শুনে থাকেন, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরও বিস্মিত হতে হয়—ম্যারাডোনা কতটা সর্বব্যাপী।
ইতালি একটি ধর্মপ্রাণ দেশ, আর নাপোলিজুড়ে অসংখ্য গির্জা রয়েছে। তবুও ম্যারাডোনা যেন নিজেও এক ধরনের দেবতায় পরিণত হয়েছেন। ২০২০ সালে তার মৃত্যুর পর নাপোলির স্টেডিয়ামের নামও তার নামে রাখা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্কটিশ ফুটবলার স্কট ম্যাকটোমিনে ম্যানচেস্টারের রাস্তা ছেড়ে নাপোলিতে এসেছেন। সামাজিক মাধ্যমে সমালোচিত একজন খেলোয়াড় থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন শহরের প্রিয় আইকন।
অতীত ও বর্তমানের খেলোয়াড়দের ছবি শহরের সরু আঁকাবাঁকা গলির দেয়ালে শোভা পায়। বার ও রেস্তোরাঁগুলোতে ঝুলে থাকে তাদের জার্সি। এমনকি কুকুরদেরও দেখা যায় নাপোলির বিখ্যাত আকাশি-নীল জার্সি পরে ঘুরতে।
ফুটবলার হওয়ার জন্য নাপোলির চেয়ে ভালো শহর আর নেই। এখানে মানুষ কঠোর পরিশ্রম ও আবেগকে সম্মান করে এবং আপনাকে আপন করে নিতে প্রস্তুত থাকে।
ম্যাচের আগে পুরো শহর যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। সকালের এসপ্রেসো কফি আপনাকে মুহূর্তেই চাঙ্গা করে দেয়। দুপুরে খেতে পারেন বিশ্বের সেরা পিজ্জাগুলোর একটি। এরপর বিকেল কাটে রোদে বসে পানীয় হাতে, হোক সেটা বরফ-ঠান্ডা লেগার কিংবা শহরের অসংখ্য বারে জনপ্রিয় অ্যাপেরল স্প্রিটজ।
এরপর আপনি পৌঁছে যাবেন ‘স্টাদিও দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা’ স্টেডিয়ামে। বিশাল, পুরনো কাঠামোটি দেখে মনে হয় যেন ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই দৃশ্যকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তোলে দিগন্তরেখা, আর পরিষ্কার দিনে দূরে দেখা যায় ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি।
স্টেডিয়ামের বাইরে শিশুরা মদ, কফি ও সিগারেট বিক্রি করে। তারপর আপনি ভেতরে প্রবেশ করেন। ধূমপান নিষিদ্ধ থাকলেও সেই নিয়মকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বরং বলা যায়, প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়। ভেতরে থাকা ৫৪ হাজার দর্শক এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি করে।
কুর্ভা বি-এর আল্ট্রাস সমর্থকগোষ্ঠী ইতালির সবচেয়ে আবেগপ্রবণ সমর্থকদের মধ্যে অন্যতম। তারা নিজেদের দলকে সমর্থন করাকে যেন এক ধরনের পারফরম্যান্স আর্টে পরিণত করেছে।
পৃথিবীতে অনেক অসাধারণ ফুটবল শহর রয়েছে, যেখানে আছে দুর্দান্ত দল, অসাধারণ সমর্থক এবং অসংখ্য ট্রফি।
কিন্তু ক্লাব ও নাগরিক জীবনের এমন পূর্ণাঙ্গ মেলবন্ধন আর কোথাও নেই, যেমনটি দেখা যায় নাপোলিতে। পুরো শহরে ছড়িয়ে থাকে সেই বিখ্যাত আকাশি-নীল রং, আর প্রায় প্রতিটি জানালা ও বারান্দায় দেখা যায় জার্সি, স্কার্ফ কিংবা পতাকা ঝুলতে।