আইসক্রিমের কথা উঠলেই সাধারণত নরম, দ্রুত গলে যাওয়া মিষ্টি খাবারের কথাই মনে আসে। কিন্তু তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী ‘মারাশ দন্দুরমা’ একেবারেই ভিন্ন। এটি এতটাই স্থিতিস্থাপক যে টানলে রাবারের মতো লম্বা হয়, আবার গরম আবহাওয়াতেও সহজে গলে না।
এই ব্যতিক্রমী আইসক্রিমের রহস্য লুকিয়ে আছে ‘সালেপ’ নামের একটি বিশেষ অর্কিড-ভিত্তিক ময়দায়, যা বিশ্বের অন্য কোথাও নয়, শুধু তুরস্কেই উৎপাদিত হয়।
তুরস্কের পর্যটন নগরী ইস্তাম্বুলে গেলে প্রায়ই দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা বিক্রেতারা লম্বা ধাতব দণ্ড দিয়ে আইসক্রিম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিবেশন করছেন। কখনও ক্রেতার দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন, আবার মুহূর্তেই সরিয়ে নিচ্ছেন। এই মজার পরিবেশন পদ্ধতি দন্দুরমাকে পর্যটকদের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত দন্দুরমার স্বাদ পেতে হলে রাস্তার দোকানের বদলে কারিগরি দক্ষতায় তৈরি আইসক্রিম পার্লারে যাওয়া উচিত।
ইস্তাম্বুলভিত্তিক গুরমে আইসক্রিম ব্র্যান্ড ‘সেরেজ গুরমে দন্দুরমা’র প্রতিষ্ঠাতা সেরদার কেমাহলি জানান, আধুনিক বাজারে কৃত্রিম রং ও স্বাদের আইসক্রিমের ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাওয়া আসল দন্দুরমাকে ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ এক বছরের গবেষণা ও পরীক্ষার পর তিনি নিজের রেসিপি তৈরি করেন।
দন্দুরমা তৈরিতে মূলত ব্যবহার করা হয় দুধ, বিট চিনি এবং সালেপ। এর সঙ্গে যোগ করা হয় ‘মাস্টিক’ নামের এক ধরনের উদ্ভিজ্জ রজন, যা আইসক্রিমকে আরও বেশি স্থিতিস্থাপক করে।
কেমাহলির ভাষ্য অনুযায়ী, সালেপে থাকা ‘গ্লুকোম্যানান’ নামের একটি প্রাকৃতিক অণু তার নিজ ওজনের প্রায় ২০০ গুণ পানি ধরে রাখতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই দন্দুরমা সাধারণ আইসক্রিমের তুলনায় বেশি ঘন, মসৃণ এবং সহজে গলে না।
তবে এই সুস্বাদু আইসক্রিমের জনপ্রিয়তা এখন এক পরিবেশগত সংকটও তৈরি করেছে। সালেপ তৈরি হয় ড্যাকটিলোরাইজা রোমানা নামে অর্কিডের কন্দ থেকে। এক কেজি খাঁটি সালেপ পাউডার উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার অর্কিড গাছ প্রয়োজন হয়।
অতিরিক্ত ও অবৈধ সংগ্রহের কারণে এই অর্কিড বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ চুক্তির সুরক্ষা দিয়েছে। তুরস্ক সরকারও সালেপ রপ্তানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর এখনও লাখ লাখ অর্কিড অবৈধভাবে তুলে ফেলা হচ্ছে, যা প্রজাতিটির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ কারণে বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম সালেপ ব্যবহার করলেও কিছু ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিমাণে আসল সালেপ ব্যবহার করে টেকসই চাষাবাদকে উৎসাহিত করছে।
পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিয়ে সেরেজ গুরমে দন্দুরমা স্থানীয় খামার থেকে ফল সংগ্রহ করে এবং কীটনাশকমুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, শুধু আইসক্রিম তৈরি করাই নয়, বরং আইসক্রিম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করাও তাদের দায়িত্ব।
খাদ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক গাইড ‘টেস্টঅ্যাটলাস’ ২০২৫ সালে দন্দুরমাকে বিশ্বের সেরা হিমায়িত ডেজার্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অসাধারণ তাপ-প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অনন্য চিবানো যায় এমন টেক্সচার একে বিশ্বের অন্যান্য আইসক্রিম থেকে আলাদা করেছে।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—আসল দন্দুরমার স্বাদ নিতে হলে ভ্রমণপিপাসুদের এখনো তুরস্কেই যেতে হবে। কারণ এর প্রাণ, অর্থাৎ খাঁটি সালেপ, দেশটির বাইরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।