আলবেনিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের সংরক্ষিত জলাভূমিতে বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার এমন এক পর্যটন মডেল চাপিয়ে দিতে চাইছে, যা ধনী বিদেশি পর্যটকরা ব্যবহার করবে। কিন্তু স্থানীয় মানুষের স্বার্থ ও পরিবেশকে থাকবে উপেক্ষিত।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছে, ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এই রিসোর্ট বানানোর পরিকল্পনা করছে।
সাযান দ্বীপ ও জভেরনেক উপদ্বীপের উপকূলে এই বৃহৎ পর্যটন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। মূলত এই পরিকল্পনা সামনে আসার পর রাজধানী তিরানায় টানা ১৮ দিন ধরে বিক্ষোভ চলছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, তাদের বিক্ষোভে ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করেছে।
জভেরনেক উপদ্বীপটি ভিয়োসা-নার্তা বদ্বীপের অংশ, যা ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি মঙ্ক সিল ও লগারহেড সামুদ্রিক কচ্ছপসহ ৭০টি বিপন্ন প্রাণী প্রজাতির আবাসস্থল। এছাড়া এখানে ফ্লেমিঙ্গো, ডালমেশিয়ান পেলিক্যানসহ অসংখ্য পরিযায়ী পাখি দেখা যায়।
মে মাসের শেষ দিকে এক পডকাস্টে ইভাঙ্কা ট্রাম্প জানান, তিনি ও জ্যারেড কুশনার বিশ্বের খ্যাতনামা স্থপতিদের নিয়ে সেখানে “বিশাল পরিসরের” একটি রিয়েল এস্টেট প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছেন।
তবে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার আগেই জভেরনেক এলাকায় বুলডোজার আনা হয়েছে এবং প্রকল্প এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশকর্মী গ্রিগর মালো বলেন, “দুরেস ও সারান্দার মতো উপকূলীয় এলাকায় অপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রণহীন উন্নয়নের ফল আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি। একসময়ের সুন্দর পর্যটন গন্তব্যগুলো আজ অনেকাংশে তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়েছে।”
তার মতে, সরকার যে বিলাসবহুল পর্যটনের ধারণা প্রচার করছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর সন্দেহ রয়েছে। কারণ এই ধরনের প্রকল্পে লাভবান হন অল্প কয়েকজন বিনিয়োগকারী ও বড় ভূমির মালিক, অথচ প্রকৃতি ও স্থানীয় পরিবেশ নির্মাণযজ্ঞের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’
প্রথমে পরিবেশ রক্ষার দাবিতে শুরু হলেও আন্দোলনটি এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। বর্তমানে এটি ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’ নামে পরিচিত। আন্দোলনকারীরা সরকারের পরিবর্তন, দুর্নীতির অবসান এবং এমন একটি ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করছেন যা তাদের মতে কেবল প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে।
বামপন্থি রাজনৈতিক দল লেভিজা বাশকের নেতা আরলিন্ড কোরি বলেন, “আমরা পর্যটনের বিরুদ্ধে নই। আমরা এমন একটি মডেলের বিরুদ্ধে, যেখানে অর্থপাচার হয়, স্থানীয় মানুষের সম্পত্তির অধিকার উপেক্ষা করা হয়, পরিবেশকে ধ্বংস করা হয় এবং লাভবান হয় প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী, পুরো অর্থনীতি নয়।”
পর্যটন চাই, তবে হতে হবে টেকসই
ইউরোপের দরিদ্র দেশগুলোর একটি আলবেনিয়া। দেশটির অর্থনীতিতে পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালে আলবেনিয়ায় বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি; আর ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
তবে পর্যটন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ পরিবেশগত প্রভাব, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় বার্ডলাইফের আঞ্চলিক পরিচালক এরিয়েল ব্রুনার বলেন, “আলবেনিয়া ইতোমধ্যে তার উপকূলের একটি বড় অংশ অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে হারিয়েছে। কিন্তু এখনও দেশটিতে অসাধারণ কিছু প্রাকৃতিক এলাকা রয়েছে, যার মধ্যে ভিয়োসা-নার্তা বদ্বীপ অন্যতম। এসব এলাকা অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, “বেশির ভাগ আলবেনিয়ানই সমৃদ্ধ পর্যটন খাত দেখতে চান। কিন্তু তারা চান উন্নয়ন হোক আইনের আওতায়, দুর্নীতিমুক্তভাবে, দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং এমনভাবে যাতে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হয়, কেবল প্রভাবশালী কয়েকজনের মুনাফা নয়।”
‘আমরা দুবাই হতে চাই না’
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ সংগঠন ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড প্রিজারভেশন অব ন্যাচারাল এনভায়রনমেন্ট ইন আলবেনিয়ার’ সদস্য মেলিতিয়ান নেজাই শুরু থেকেই বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন।
তার ভাষায়, আন্দোলনকারীদের মুখে সবচেয়ে বেশি যে বার্তাটি শোনা যাচ্ছে, তা হলো—“আমরা দুবাই হতে চাই না।”
বিক্ষোভকারীদের মতে, আলবেনিয়ার ভবিষ্যৎ এমন পর্যটনের ওপর নির্ভর করা উচিত, যা দেশের অনন্য প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করবে; কংক্রিটের বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণের মাধ্যমে সেগুলোকে বিসর্জন দিয়ে নয়।