মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরেই চা-বাগান, লাউয়াছড়া বন, পাহাড়ি টিলা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের কাছে পরিচিত। এবার সেই পর্যটন মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অরণ্যে ছড়িয়ে থাকা ৩০টিরও বেশি প্রাচীন গিরিখাত। স্থানীয়দের মতে, এসব গিরিখাতের কিছু অংশ কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এবং কয়েকটি বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ভেতরেও প্রবেশ করেছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন নাহার চা-বাগানের পাশের পুঞ্জি এলাকার গভীর অরণ্যে অবস্থিত এসব গিরিখাত দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় খাসিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কাছে পরিচিত ছিল। তবে সম্প্রতি এগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে পর্যটন ও গবেষণার সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে।
স্থানীয়রা গিরিখাতগুলোর নাম দিয়েছেন ‘লাসুবন’, ‘ক্রেম উল্কা’, ‘ক্রেম কেরি’সহ বিভিন্ন নামে। স্থানীয় ভাষায় ‘লাসুবন’-এর অর্থ পাহাড়ি ফুল। এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখেই এসব নামকরণ করা হয়েছে।
গিরিখাতগুলোর আশপাশে রয়েছে গভীর গুহা, পাহাড়ি ঝরনা, ছোট জলপ্রপাত এবং বৈচিত্র্যময় শিলা গঠন। ফলে অঞ্চলটি প্রকৃতিপ্রেমী, গবেষক এবং রোমাঞ্চপ্রিয় ভ্রমণকারীদের জন্য একটি অনন্য আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রকৃতিভিত্তিক ও অভিযাত্রিক পর্যটনের বিকাশে এ ধরনের স্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক সমন্বয়কারী তাজুল ইসলাম জাবেদ জানান, ২০১৮ সালে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা নিয়ে কাজ করার সময় তিনি প্রথম এসব গিরিখাতের সন্ধান পান। পরে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী এলাকাটি পরিদর্শন করেন।
তিনি বলেন, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং জনসমাগমের অভাবে দীর্ঘদিন স্থানটি সাধারণ মানুষের নজরের বাইরে ছিল। পরে করোনা মহামারির সময় চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় সম্ভাব্য পর্যটন উন্নয়ন উদ্যোগও থেমে যায়।
গিরিখাত এলাকায় পৌঁছাতে হলে প্রথমে সিন্দুরখানের পাহাড়ি এলাকায় যেতে হয়। এরপর খাড়া পাহাড়ি ছড়া, ঘন জঙ্গল ও পাথুরে পথ পেরিয়ে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হয়। এ কারণে স্থানটি এখনও অনেকাংশে অনাবিষ্কৃত ও অপরিচিত রয়ে গেছে।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন ও তৎকালীন ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিন লাসুবন গিরিখাত পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর জেলা প্রশাসক তাঁর ফেসবুক পেজে স্থানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রশংসা করে এটিকে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, তৎকালীন ইউএনও জানিয়েছিলেন, এলাকায় যাতায়াত সহজ করতে সড়ক ও সেতু নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। একটি সেতুর নির্মাণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নও ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।