যদি নিয়মিত ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট দেখেন, তাহলে এক ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অবশ্যই চোখে পড়বে।
এরা ভিডিওর শুরুতেই ক্যামেরার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলবে, "আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে, এই জায়গাটা সম্পর্কে মানুষ এখনো জানে না!"
ভ্রমণবিষয়ক লেখক স্যাম ফেরলে মনে করেন, তারা যে জায়গার কথাই বলুক না কেন, এই সংলাপটি মূলত সেই জায়গা ধ্বংসের সূচনা ঘটায়।
ব্রিটিশ সাময়িকী ফার আউটে তিনি লিখেছেন, ভিডিওটি শেষ হওয়ার আগেই মানুষ জায়গাটি তাদের গুগল ম্যাপে সেভ করতে শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে ভেতরে ঢোকার লম্বা লাইন পড়ে যায়, আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই লাইন রাস্তা পর্যন্ত নেমে আসে।
চারদিকে ক্যামেরার ছড়াছড়ি আর সবাই যার যার ফ্রন্ট ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
দ্রুতই সেখানকার সবকিছুর দাম তিনগুণ হয়ে যায়, নতুন অতিরিক্ত কর্মচারীদের মধ্যে আগের সেই আন্তরিকতা থাকে না, আর অচিরেই সেই বিশেষ আকর্ষণটি হারিয়ে যায় যা জায়গাটিকে অনন্য করে তুলেছিল। এটাই হলো ‘হিডেন জেম’ ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স বা বাণিজ্যিক চক্র।
একটা সময় ছিল, যখন ‘লুকানো রত্ন’ কথাটির সত্যিই একটা অর্থ ছিল। এটি ছিল এমন এক তথ্য যা বিশ্বস্ত মানুষেরা একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করতেন, যারা মনে করতেন, অপরজন তথ্যটি জানার যোগ্য।
ছুটির দিন কাটিয়ে আসার পর আপনি হয়ত আপনার কোনো বন্ধুর সাথে কথা বলছেন, আর সে আপনাকে কোনো এক গলির ভেতরের চমৎকার এক রেস্তোরাঁর কথা জানাল, যেখানে শুধু স্থানীয়রাই যায় এবং কোনো মেনু কার্ডও নেই।
অথবা, এটি হতে পারত এমন কিছু যা আপনি ভ্রমণের সময় নিজে থেকে জানতে পেরেছেন। যেমন ধরুন, আপনি বার্সেলোনার কোনো এক ক্রাফট বিয়ারের দোকানে বসে আছেন, আর বারটেন্ডার আপনাকে এমন এক জায়গার কথা বলল যেখানে সে এবং তার বন্ধুরা ছুটির দিনে আড্ডা দিতে যায়—যা লা রামব্লাসের উপচে পড়া ভিড় থেকে অনেক দূরে।
এই ‘হিডেন জেম’ বা ‘লুকানো রত্ন’ ধারণাটি ছিল এক ধরনের গোপন ইশারা বা সংকেত, যা কেবল সেই জায়গার পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারা মানুষদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। এটি কোনো পরম রহস্য ছিল না, তবে মুখের কথার মাধ্যমে এই তথ্য কেবল ডজনখানেক, বড়জোর শতখানেক, কিংবা খুব বেশি হলে বছরের পর বছর ধরে হাজারখানেক মানুষের কাছে পৌঁছাত। এর ফলে সঠিক মানুষগুলোই সেই জায়গাগুলো খুঁজে পেত এবং ভুল মানুষের আনাগোনা থেকে জায়গাটি রক্ষা পেত।
তথ্যের সেই ধীর ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ এখন ফায়ার সার্ভিসের পানির পাইপের তীব্র স্রোতের মতো রূপ নিয়েছে, যেখানে 'হিডেন জেম' নিজেই এখন কনটেন্টের একটি আস্ত ক্যাটাগরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এটি এখন একটি এসইও টার্ম, যা আপনার নানি-দাদিরাও হয়তো ফেসবুকে সার্চ করেন। বহুলাংশে এটি কথা বলার বা উপস্থাপনার একটি নির্দিষ্ট ধরন হয়ে উঠেছে।
ফেরলে লিখেছেন, যখন প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সাররা কোনো জায়গাকে ‘লুকানো রত্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেন, তখন এটা বলাই বাহুল্য যে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে (অর্থাৎ জায়গাটি আর মোটেও লুকানো নেই)। 'লুকানো' শব্দটি হয়তো সততা বা অকৃত্রিমতার জানান দেয়, কিন্তু কোনো ইনফ্লুয়েন্সার যখন তা আবিষ্কার করে ফেলেন, তখন সেটি আর আসলেই লুকানো থাকে না। কদাচিৎ যদি তা সত্যিই কোনো হিডেন জেম হয়েও থাকে, তবে তাদের লাখ লাখ অনুসারী জেনে যাওয়ার পর সেটি আর বেশিদিন লুকানো থাকে না।
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম দর্শককে ধরে রাখাকে পুরস্কৃত করে, তাই এই ক্রিয়েটররা প্রায়ই ভিডিওটি ভাইরাল করার জন্য রহস্য ও অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেয় যাতে আপনি শেষ পর্যন্ত দেখতে বাধ্য হন। এরপর, আপনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখবেন শত শত মানুষ একই বার বা রেস্তোরাঁয় গিয়ে হুবহু একই ভিডিওর পুনরাবৃত্তি করছে। এই পৃথিবীটা যখন ক্রমেই চষে ফেলা বা পুরোপুরি আবিষ্কৃত বলে মনে হয়, তখন হিডেন জেমের এই বাণিজ্যিক চক্র আমাদের একজন সত্যিকারের 'অভিযাত্রী' হওয়ার কাল্পনিক আনন্দ দেয়। এই মুহূর্তে পুরো পৃথিবীর ম্যাপ মূলত তৈরি হয়ে গেছে, এমনকি সবচেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তাই প্রথম হওয়ার যেকোনো সুযোগ মানুষ তীব্রভাবে লুফে নিতে চায়।
ছোটখাটো স্ট্রিট ফুড বিক্রেতা থেকে শুরু করে আস্ত একটি শহরের ক্ষেত্রেও আমরা এটি লক্ষ্য করেছি। যেমন চীনের সাইবারপাঙ্ক মেগাসিটি 'চংকিং'-এর কথাই ধরা যাক, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায় রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায়। সমৃদ্ধ ইতিহাসের এটি একটি চমৎকার জায়গা, কিন্তু ইউটিউবে আমরা প্রতিটি ভিডিওতে একই জায়গা এবং একই রেস্তোরাঁ দেখতে পাই।
হংইয়া কেভের ঝলমলে আলো না দেখিয়ে চংকিং-এর ওপর কোনো ভিডিও আপনি দেখতে পাবেন না। কিন্তু বাস্তবে সেখানে গেলে আপনি জায়গাটিকে একদম অপছন্দ করবেন; আপনি সেখানকার ভিড়, শোরগোল, প্রতি দশ সেকেন্ডে মানুষের ধাক্কা খাওয়া এবং সস্তা জিনিসপত্রের বিক্রি দেখে বিরক্ত হবেন। অথচ, আপনি যদি শহরটির একটু ভেতরের দিকে যান, তবে এই তথাকথিত ‘লুকানো রত্নের’ চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ ও চমৎকার সবকিছুর সন্ধান পাবেন।
পরবর্তী হিডেন জেম খুঁজে পাওয়ার এই উন্মাদনা কেবল অতি-বাণিজ্যিকীকরণই ডেকে আনে। আমরা দেখি আজ যে জায়গাটি কানায় কানায় পূর্ণ, এক বছরের মধ্যে সেটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারণ নতুন যেসব বাড়তি খরচ বা সেটআপ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা দিয়ে তারা আর লাভ করতে পারছে না। হিডেন জেম আবিষ্কারের পেছনে এক ধরণের আভিজাত্য বা এক্সক্লুসিভিটির সুপ্ত উপাদানও কাজ করে। তবে এই ধরণের ভ্রমণ কনটেন্ট নিজেকে মূলধারার সংস্কৃতির বিরোধী হিসেবে জাহির করতে চাইলেও, বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ উল্টো। এই ক্রিয়েটরদের কথা শুনলে আপনার মনে হবে তারা পর্যটক-বিরোধী এবং তারা জায়গাগুলোকে আগের মতোই সুন্দর ও শান্ত রাখতে চায়, কিন্তু তাদের তৈরি ভিডিওগুলো আসলে ঠিক এর বিপরীত কাজটিই করে।
যদিও হিডেন জেমগুলো প্রায়শই স্বল্পমেয়াদে আয়ের একটি বড় সুযোগ পায়, কিন্তু একই সাথে তাদের এই আকস্মিক পরিবর্তনের সব প্রাথমিক ঝক্কি-ঝামেলাও পোহাতে হয়। অন্যদিকে, ক্রিয়েটররা বিজ্ঞাপনের অর্থ পকেটে পুরে কোনো রকম কষ্ট বা পরিশ্রম ছাড়াই অন্য জায়গায় চলে যায়। এরপর তারা পরবর্তী কোনো স্ট্রিট ফুড স্টলে হাজির হয় এবং দাবি করে যে এটি তাদের জীবন বদলে দিয়েছে—আর এভাবেই কনটেন্ট তৈরির এই অন্তহীন চক্র চলতেই থাকে।
এর মানে এই নয় যে আপনি কম পরিচিত জায়গাগুলো নিয়ে লিখবেন না বা কনটেন্ট তৈরি করবেন না, তবে আমাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। কাল্পনিক গল্প না ফেঁদে জায়গাটিকে ঠিক যেমন, তেমনই তুলে ধরা উচিত।
আপনি যদি সেরা ভ্রমণ কনটেন্টগুলোর দিকে তাকান, তবে দেখবেন সেগুলো সংশ্লিষ্ট জায়গার গল্প, সেখানকার দৃশ্য এবং পরিবেশকে ফুটিয়ে তোলে। অথচ হিডেন জেম ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স জায়গাগুলোকে কেবল ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। অ্যান্থনি বর্ডেইনের মতো কেউ যখন কোনো জায়গাকে ভাইরাল করেন, তখন তিনি কেবল সেই স্পটগুলোকে 'হিডেন জেম' হিসেবে বিক্রি করেন না যা প্রতিটি পর্যটকের দেখাই চাই; বরং তিনি সেখানকার ইতিহাস, চরিত্রগুলো এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তোলেন।