১৯৯৬ সালের ১০ মে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্টে ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আকস্মিক তুষারঝড়ে ৩০ জনের বেশি আরোহী আটকা পড়েন ‘ডেথ জোনে’। ঘণ্টায় ৭০ মাইলের বাতাস, মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং অক্সিজেনের ঘাটতির মধ্যে প্রাণ হারান আটজন।

সাংবাদিক ও পর্বতারোহী জন ক্রাকাওয়ারের বই ‘ইনটু থিন এয়ার’ প্রকাশের পর ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
তিন দশক পর এভারেস্ট অনেকটাই বদলে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে পর্বতটি আগের চেয়ে নিরাপদ হলেও নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। খবর: সিএনএন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এভারেস্টের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আর প্রতিকূল আবহাওয়া নয়; বরং অতিরিক্ত ভিড়, অনভিজ্ঞ আরোহী এবং নিম্নমানের বাণিজ্যিক সেবা।
১৯৫৩ সালে তেনজিং নোরগে ও অ্যাডমন্ড হিলারি প্রথম এভারেস্ট জয় করার পর ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত মোট ২৭০টি সফল আরোহনের রেকর্ড ছিল। অথচ বর্তমানে একদিনেই প্রায় একই সংখ্যক মানুষ শৃঙ্গ স্পর্শ করছেন। গত মে মাসে একদিনে ২৭৪ জন আরোহী এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রযুক্তির উন্নতির ফলে ১৯৯৬ সালের মতো আকস্মিক ঝড়ের ঝুঁকি অনেক কমে গেছে। এখন অভিযানের সময় নির্ধারণ করা হয় অত্যন্ত নির্ভুল আবহাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। পাশাপাশি পর্বতে বাড়ানো হয়েছে অক্সিজেন সরবরাহ, চিকিৎসা সহায়তা এবং উদ্ধার ব্যবস্থাও।
তবে আরোহীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার ফলে নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। এভারেস্টে এখন প্রায়ই দীর্ঘ সারি বা ‘ট্রাফিক জ্যাম’ তৈরি হয়। এতে আরোহীদের অতিরিক্ত সময় উচ্চতায় অবস্থান করতে হয়, যা অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়া, হাইপোক্সিয়া এবং ‘ফ্রস্টবাইটের’ ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

এভারেস্ট অভিযানে নেপালি শেরপাদের ভূমিকা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পথ প্রস্তুত করাই নয়, বর্তমানে অনেক শেরপা আন্তর্জাতিক মানের গাইড ও সফল ব্যবসায়ী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তবে তাদের জীবনঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খুম্বু আইসফল অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলছে, ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।

২০১৪ সালে তুষারধসে ১৬ জন নেপালি কর্মীর মৃত্যু এবং ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে এভারেস্ট অঞ্চলে আরও প্রাণহানির ঘটনা শেরপাদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশকে সামনে নিয়ে আসে। শেরপা পরিবারগুলোর জন্য উন্নত বীমা ও ক্ষতিপূরণের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
বর্তমানে এভারেস্ট অভিযানের খরচ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ডলারের মধ্যে হলেও বিলাসবহুল প্যাকেজের দাম ৩ লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় কিছু প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা মান বজায় না রেখেই অভিযান পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সব বিতর্ক, ঝুঁকি ও দুর্ঘটনার পরও এভারেস্ট এখনও বিশ্বের লাখো মানুষের স্বপ্নের প্রতীক। কারণ বিশ্বের ছাদে দাঁড়ানোর অনুভূতি আজও মানবজাতির অন্যতম বড় অভিযাত্রিক আকাঙ্ক্ষা হয়ে আছে।