দিগন্তজোড়া জলরাশি, নদীর বুকে ছুটে চলা ঢেউ, শীতল বাতাস আর মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্ত। এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে লক্ষ্মীপুরের রামগতির চর আলেকজান্ডারের মেঘনাপাড় এখন পরিণত হয়েছে জনপ্রিয় ভ্রমণকেন্দ্রে। বিশেষ করে ঈদ ও সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এখানে ভিড় জমাচ্ছেন হাজারো দর্শনার্থী। বিস্তৃত নদীতীর আর সৈকতসদৃশ পরিবেশের কারণে স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মেঘনার পাড়ে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। কেউ পরিবার নিয়ে সময় কাটান, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলেন, আবার কেউ ট্রলার বা স্পিডবোটে নদী ভ্রমণে বের হন। পশ্চিম আকাশে সূর্যের লাল আভা নদীর জলে ছড়িয়ে পড়লে তৈরি হয় এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় উপজেলা রামগতির চর আলেকজান্ডারে অবস্থিত এ মেঘনাপাড় প্রথম দেখায় অনেকের কাছেই সমুদ্রসৈকতের অনুভূতি তৈরি করে। নদীভাঙন প্রতিরোধে নির্মিত বাঁধের কারণে নদীতীরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিস্তৃত খোলা পরিবেশ, যা পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে ধরা দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মেঘনাপাড় রামগতি ও আশপাশের এলাকার অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। লক্ষ্মীপুর ছাড়াও নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। ঈদ, সরকারি ছুটি কিংবা উৎসবের সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

সম্প্রতি নোয়াখালী থেকে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসা তুষার মাহমুদ বলেন, ফেসবুকে এ জায়গার ভিডিও দেখার পর থেকেই এখানে আসার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। ঈদের ছুটিতে এসে নদীর বাতাস, খোলামেলা পরিবেশ ও সূর্যাস্ত উপভোগ করে তাঁর ভালো লেগেছে।

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থেকে আসা রাজু আহমেদ বলেন, মেঘনার পাড়ে এসে তাঁর মনে হয়েছে যেন একটি ছোট সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে আছেন। বিশেষ করে বিকেলের দৃশ্য তাঁকে মুগ্ধ করেছে।

কেন জনপ্রিয় হচ্ছে মেঘনাপাড়

আলেকজান্ডার মেঘনাপাড়ের প্রধান আকর্ষণ এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিস্তীর্ণ নদী, দিগন্তজোড়া জলরাশি, ঢেউয়ের ছন্দ, শীতল বাতাস এবং সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে টেনে আনে এখানে।

এ ছাড়া ট্রলার বা স্পিডবোটে নদী ভ্রমণ, দূরে জেগে ওঠা চর দেখা এবং জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগও পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সাধারণ দিনে কয়েক হাজার মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। আর ঈদ, সরকারি ছুটি ও বিশেষ উৎসবের সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রশাসনের ধারণা, এমন দিনগুলোতে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ এ এলাকায় সমবেত হন।

ইতিহাসের ছোঁয়া

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনামলে ‘আলেকজান্ডার’ নামে এক ইংরেজ রাজস্ব কর্মকর্তা এ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর নাম অনুসারেই এলাকার নামকরণ করা হয় ‘আলেকজান্ডার’। সময়ের পরিক্রমায় সেই নামই আজও বহাল রয়েছে।

সৌন্দর্যের আড়ালে কিছু সীমাবদ্ধতা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি কিছু সমস্যাও রয়েছে এ পর্যটনস্থানে। সরেজমিনে দেখা গেছে, পর্যটক বহনকারী অনেক ট্রলার ও স্পিডবোটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসামগ্রী নেই। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়েও নৌভ্রমণ পরিচালনা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া পর্যাপ্ত বসার স্থান, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার এবং অন্যান্য মৌলিক পর্যটনসুবিধারও ঘাটতি রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক মুকুল চৌধুরী বলেন, নদীভাঙন প্রতিরোধে নির্মিত বাঁধের কারণেই এখানে বেলাভূমির মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ ছাড়া এই সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, লক্ষ্মীপুরে বিনোদনের স্থান তুলনামূলক কম। তাই মানুষ পরিবার নিয়ে এখানে আসেন। পর্যটকদের সুবিধার্থে বসার স্থান, শৌচাগার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।

রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রলার ও স্পিডবোটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত গণশৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

যেভাবে যাবেন

লক্ষ্মীপুর জেলা শহর থেকে আলেকজান্ডার মেঘনাপাড়ের দূরত্ব প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার। লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা।

অন্যদিকে নোয়াখালীর মাইজদী থেকে এ স্থানের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। উন্নত সড়ক যোগাযোগের কারণে স্বল্প সময়েই সেখানে পৌঁছানো যায়। আলেকজান্ডার বাজার বা উপজেলা পরিষদ এলাকায় পৌঁছে অল্প হাঁটলেই দেখা মিলবে বিস্তীর্ণ মেঘনাপাড়ের।