গ্রীষ্ম মানেই আমের মৌসুম। আর এই মৌসুমকে ঘিরে দেশের উত্তরাঞ্চলে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী এক ভ্রমণ আকর্ষণ। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর বিস্তীর্ণ আমবাগান, ভোরের আমহাট এবং গাছ থেকে সদ্য পাড়া আমের স্বাদ নিতে এখন ছুটছেন পর্যটকরা। দেশে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘আম পর্যটন’।
বাংলাদেশে আমের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। বর্তমান বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের কিছু অঞ্চল নিয়ে গঠিত ভূখণ্ডে বুনো আমের প্রাচীন বিস্তার ছিল বলে গবেষকদের ধারণা। বাংলা সাহিত্য, লোকগাথা ও ধর্মীয় রচনাতেও আমের উল্লেখ পাওয়া যায় বারবার।
মুঘল আমলে বাংলায় আম চাষ নতুন মাত্রা পায়। তখন গৌড়, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে গড়ে ওঠে বিস্তীর্ণ আমবাগান। ধীরে ধীরে আম শুধু খাদ্য নয়, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।
বর্তমানে দেশের ‘আমের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলার প্রায় ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়। এখানে শতবর্ষী অনেক আমগাছ এখনও ফল দিচ্ছে। খিরসাপাত বা হিমসাগর আমের জন্য জেলার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। আঁশহীন, সুগন্ধি ও মিষ্টি এই আম সাধারণত মে মাসের শেষ থেকে বাজারে আসে।
খিরসাপাতের পর বাজারে আসে ল্যাংড়া। জুনের দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হয় ফজলির মৌসুম। বড় আকার ও দীর্ঘ সময় বাজারে থাকার কারণে ফজলির জনপ্রিয়তাও ব্যাপক।
রাজশাহীকে অনেকেই ‘আমের বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে থাকেন। কারণ, এখানে শুধু আম উৎপাদন নয়, জাত উন্নয়ন, গবেষণা, বিপণন ও ব্র্যান্ডিংয়ের কাজও দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে। শহরের আশপাশের বিস্তীর্ণ বাগান এবং পদ্মাপাড়ের পরিবেশ ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
অন্যদিকে গত দুই দশকে দ্রুত এগিয়েছে নওগাঁ। বিশেষ করে আম্রপালি জাতের আমের জন্য জেলাটি পরিচিতি পেয়েছে। তুলনামূলক ছোট আকারের হলেও আম্রপালি অত্যন্ত মিষ্টি এবং কম আঁশযুক্ত। আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদের কারণে নওগাঁ এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আম উৎপাদন কেন্দ্র।
আম মৌসুমে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হলো ভোরের আমহাট। রাত শেষ হওয়ার আগেই বাগান থেকে আম সংগ্রহ শুরু হয়। কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সূর্য ওঠার আগেই সম্পন্ন হয় হাজার হাজার মণ আমের কেনাবেচা।
পর্যটকদের জন্য অনেক বাগান মালিক এখন বিশেষ ব্যবস্থা রাখছেন। কেউ বাগান ঘুরে দেখার সুযোগ দিচ্ছেন, কেউ গাছের নিচে বসে আম খাওয়ার আয়োজন করছেন। আবার অনেক জায়গায় বাগান থেকেই সরাসরি আম কেনার সুবিধা রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আঙুরখেত, ফলের বাগান বা চা-বাগানভিত্তিক পর্যটন জনপ্রিয়। সেই ধারায় বাংলাদেশেও আম পর্যটনের সম্ভাবনা ক্রমেই উজ্জ্বল হচ্ছে। মে থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়টি তাই উত্তরাঞ্চলের এই তিন জেলা ঘুরে দেখার উপযুক্ত মৌসুম।
যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে সড়ক, রেল ও আকাশপথে সহজেই রাজশাহী যাওয়া যায়। সড়ক ও রেলপথে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর সঙ্গেও রয়েছে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা।
কোথায় থাকবেন: রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলা সদরগুলোতে বিভিন্ন মানের হোটেল ও আবাসন সুবিধা রয়েছে।