বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি পথে বগালেক কিংবা কেওক্রাডংয়ের দিকে যাত্রা করলে চোখে পড়ে এক অন্যরকম জনপদ। পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে ওঠা বম সম্প্রদায়ের গ্রাম মুনলাই পাড়া শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং পরিচ্ছন্নতা, পরিকল্পিত বসতি ও কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনের সফল উদাহরণ হিসেবে পর্যটকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

রুমা উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মুনলাই পাড়ায় বসবাস করে বম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০টি পরিবার। আধুনিকতার কোলাহল থেকে দূরে থাকা এই গ্রামে এখনো টিকে আছে পাহাড়ি জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বকীয় রূপ।

গ্রামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। গোছানো ঘরবাড়ি, ঝকঝকে রাস্তা, রঙিন ফুলে সাজানো আঙিনা এবং চারপাশের সবুজ পাহাড় মিলে মুনলাই পাড়াকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। প্রতিটি বাড়ির পরিচর্যা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গ্রামবাসীদের আন্তরিকতা সহজেই নজর কাড়ে।

শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, এখানকার মানুষ ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সংস্কৃতিও ধরে রেখেছে যত্নের সঙ্গে। হাতে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী, সহজ-সরল জীবনযাপন এবং প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা এই গ্রামকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। ২০১৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা মুনলাই পাড়াকে তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে পরিকল্পিত, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম বা সামষ্টিক পর্যটন উদ্যোগও গড়ে উঠেছে এই গ্রামকে কেন্দ্র করে। ফলে পর্যটকেরা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি নানা রোমাঞ্চকর কার্যক্রমেও অংশ নিতে পারেন।

যা দেখবেন

মুনলাই পাড়ায় রয়েছে ট্রি-টপ অ্যাক্টিভিটি, কায়াকিং, জিপ লাইনিং, ক্যাম্প ফায়ার ও বারবিকিউ আয়োজনের সুযোগ। পাশাপাশি পাহাড়ি পরিবেশে রাতযাপন, সূর্যোদয় দেখা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা কাছ থেকে জানার অভিজ্ঞতাও ভ্রমণকে করে তোলে স্মরণীয়।

যেভাবে যাবেন

মুনলাই পাড়া যেতে হলে প্রথমে বান্দরবান শহরে পৌঁছাতে হবে। ঢাকা থেকে সড়কপথে বিভিন্ন পরিবহনের বাসে সরাসরি বান্দরবান যাওয়া যায়। এছাড়া ট্রেনে চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে বাসযোগে বান্দরবান পৌঁছানো সম্ভব।

বান্দরবান শহর থেকে জিপ বা চাঁদের গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি মুনলাই পাড়া যাওয়া যায়। সময় লাগে প্রায় ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা। বিকল্প হিসেবে রুমা হয়ে মোটরসাইকেল বা জিপেও যাওয়া যায়।

থাকা ও খাওয়া

মুনলাই পাড়ায় হোমস্টে ও পরিবেশবান্ধব ইকো কটেজের ব্যবস্থা রয়েছে। কাঠের মাচার ওপর নির্মিত এসব আবাসনে পরিচ্ছন্ন কক্ষ, টয়লেট ও প্রয়োজনীয় সুবিধা পাওয়া যায়।

খাওয়ার জন্য আলাদা বড় রেস্তোরাঁ না থাকলেও হোমস্টে কর্তৃপক্ষ পর্যটকদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে। পাহাড়ি জুমের চালের ভাত, দেশি মুরগি, পাহাড়ি আলু এবং স্থানীয় সবজির ঘরোয়া পদ এখানে বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

ভ্রমণ পরামর্শ

পাহাড়ি পথে ভ্রমণের সময় স্থানীয় গাইড সঙ্গে রাখা ভালো। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে রাখুন। স্থানীয় সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন এবং পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন। বর্ষা বা কুয়াশার সময়ে রাস্তা পিচ্ছিল হতে পারে, তাই চলাচলে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।